৯ জুন, ২০১৩

ইউ টার্ন

আমি অসহায় এক বালক ছিলাম, কিশোর ছিলাম, তরুণ ছিলাম। শত-শত হাজার-হাজার বিষয় জানতে-শুনতে হয়েছে যা আমি চাইনি, জেনে-মনে রেখেও কখনো আনন্দবোধ করিনি তেমন। ভার্সিটির হলে থেকে বলিউড আর হলিউডের সর্বস্ব জানা হয়েছিলো চারদিকে শুনেই। শখ করে দশটা হিন্দি মুভিও দেখিনি জীবনে, আমি তবুও ওদের অনেক নায়ক-নায়িকার কার সাথে কার সম্পর্ক-বিয়ে তা ঠিকই জেনেছি। হয়ত কানে শুনে এখন পত্রিকায় পড়লে চোখে পড়ে। কোনদিন কোন গেমস খেলতে না বসলেও কয়টা বস পার হয়ে কম্পানি অফ হিরোস, কল অফ ডিউটি, কাউন্টার স্ট্রাইক, ফিফাতে কী কী ফিচার এসেছে তা আমি ঠিকই জেনেছিলাম। ক্লাসমেট-জুনিয়রদের বদৌলতে দেশের কোন ভার্সিটিতে মেয়ের সংখ্যা কেমন আনুপাতিক, তাদের কারা কেমন, কোন নায়িকার কয়টা বিয়ে, কার গার্লফ্রেন্ড কে, কে কার এক্স-গার্লফ্রেন্ড, কোথায় কবে কাকে কার সাথে দেখা গেছে... এরকম অপ্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডারের মাঝে ডুবে থাকতাম।


একদিন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর নাম জানতে হলো আমেরিকার মানুষের কাছে। সাহাবী, তাবিঈনদের চিনতে বই কিনলাম সবগুলো। তবুও মনে থাকে না। ভালোবাসা, হৃদয় জুড়ে থাকা নেই বলেই হয়ত... অথচ, তুচ্ছ-নোংরা লোকদের নাম আমি জানি শত-শত জনের অথচ জানিনা সোনার টুকরা মানুষদের নাম, তাদের কাজের কথা। সূরা আসরের বিস্তারিত শিখতে গিয়ে যখন মানুষ ক্ষতির মধ্যে "ডুবে আছে/নিমজ্জিত" শিখলাম তখন আমার মাঝে এমন একটা অনুভূতি কাজ করলো। আমি সত্যিকার হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নিজের অজান্তে অনিচ্ছায় জেনেছি। সেই সময়ের আমার স্মৃতিশক্তির অকারণ প্রখরতা আমাকে বড় দুঃখ দেয়। বুঝি এই তথ্যভান্ডার আমার নিউরোনগুলোকে ভোঁতা করে দিয়েছে। সম্পদকে হেলায় ফেলে রেখে বোঝা বানানোর শিক্ষা  বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপায়ে উপলব্ধি করছি। সুন্দর একটা উদাহরণ হলো কয়েক সপ্তাহ ধরে 'আমানার রসুলু বিমা উনযিলা মির রব্বিহি ওয়াল মু'মিনুন' থেকে শুরু করে 'ফানসুরনা আ'আল কওমিল কাফিরিন' পর্যন্ত অংশটুকু মুখস্ত করতে চাইলেও দিব্যি কয়েকদিন পর পর ভুলে যাচ্ছি।

অনেক ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে নিজের মানসিক দৈন্যতাকে ভুলে নিজেকে উর্ধে তুলতে চাইলেও আমি ধ্বসে পড়ি। সম্ভবত এখানে নিশ্চিতভাবেই সেই ছাপ আছে। পাপের চিন্তা, পাপাসক্তদের চিন্তা, পাপ সম্পর্কদের আলাপ গ্রাস করে রাখে এই অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির পৃথিবী। এই পত্রিকা, এই ফেসবুকের অজস্র লোকের অর্থহীন নোংরা বীভৎস জাহান্নামী অপ্রয়োজনীয় আপডেট, টেলিভিশনের চ্যানেল, এফ-এম এক ফোঁটা চিন্তার শক্তিটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। নিবেই তো, যখন স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আনন্দ পাই, যখন এই উত্তপ্ত অশান্ত হৃদয়টাকে শান্ত করতে কোন সুমিষ্ট শব্দের টলটলে পানির পুকুরে ডুব দিতে না চাই আমরা, এমনটাই তো হবে...

এরকম করেই অনেক আগেও বুঝতে পারতাম অল্প অল্প। তখন থেকে এখন খুব একটা বদলে যেতে পারিনি। একদম পারিনি তাও না। আহাজারির কোন মূল্য নেই বুঝি। শুনলাম, মেনে নিলাম মানুষেরা বসে থাকেনা। তারা ইউটার্ন নেয়। ইউটার্নের অপেক্ষায় থাকি নিজের ভিতর থেকে। ইকরিমা থেকে ইকরিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হবার মতন ইউটার্ন হলো মু'মিনের পরিবর্তন। বদলে গিয়েছিলেন ফুদাইল ইবনে ইয়াদ, ডাকাত থেকে একজন গভীর জ্ঞানের তাবিঈন হয়ে গিয়েছিলেন। সবকিছুতে থেকে, দুনিয়ায় ডুবে থেকে, নোংরামিতে ডুবে থেকে কী করে আলাদা করব সত্য আর মিথ্যা? কীভাবে বুঝব কুরআন যে ফুরকান? কীভাবে বুঝবো এই ঈমান আমাকে পারবে কিনা পুলসিরাত পার করাতে? ঈমানের ঔজ্বল্য যখন নিভু নিভু অন্ধকার, 'নুরুন আলা নুর' কীভাবে হবে?

০৮ জুন, ২০১৩