২৭ অক্টোবর, ২০১১

বেদনা মধুর হয়ে যায়


বেদনা মধুর হয়ে যায়,তুমি যদি দাও,
মুখের কথায় হয় যে গান তুমি যদি গাও...

গানটা মনে পড়ছিলো। বেদনাক্লিষ্ট হয়ে এই গানটাই মনে পড়লো কারণ আজকের দিনটা ছিলো অনেক বেদনাক্লিষ্ট, সময়টাই যাচ্ছে বেদনাময়। চারিদিকে বেদনার ধোঁয়াশা। তাছাড়া গানটির শিল্পী জগজিত সিং। বিখ্যাত আর জনপ্রিয় এই শিল্পী ক'দিন আগে চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে। তার একটা অন্যতম বহুল প্রচলিত আর খ্যাত একটা সঙ্গীত এই "বেদনা মধুর হয়ে যায়"।

এই গানটার সাথে আমার জীবনের কিছু স্মৃতি আছে। আমি তখন অনেক ছোট, প্রাইমারিতে পড়ি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার স্মৃতি অন্য অনেক নিষ্কলুষ মনের বালকদের মতই ব্যাপক শক্তিশালী। তখন যেই গান শুনি, প্রায় দু'একবারেই পুরোটা মুখস্ত হয়ে যায়। জগজিত সিং-এর এই গানটাও তখনকার একটা ব্যাপার। মজার ব্যাপার হলো -- বাসায় গানগুলো শোনার উপায় ছিলোনা, শোনা হয়নি। পথে ঘাটেই শুনেছিলাম। আরেকটু বড় হলাম - কিশোর বয়স। আপন মনে গুণগুণ করে গানটা গাইতে গিয়ে খেয়াল করেছিলাম একদিন -- কার জন্য অমন করে বেদনা "মধুর" হয়ে যায়? প্রেমিকার আবির্ভাব জীবনে যেহেতু তখন হয়নি -- তাই উত্তর জানাও হয়নি।

তারপরে অনেক বছরে পেরিয়ে যাবার পরে একদিন গানটা আমার স্মরণে এসে মুখ দিয়ে যখন বের হতে লাগলো -- "বেদনা মধুর হয়ে যায় -- তুমি যদি দাও", সেদিন আবিষ্কার করলাম। আমার জীবনে কোনদিন, কোন অবস্থাতেই কারো দেয়া বেদনায় মধুর হয়নি। আমার প্রিয়তম মা-বাবা কোনদিন বেদনা দেননি, মধুর লাগার দরকার পড়েনি। ভাইবোনদের মতন এত আপন মানুষগুলো আমাকে যখন বেদনা দিয়েছেন, তা আমার কাছে বিকট তিক্ত লেগেছে -- মধুর কখনো লাগেনি। যদিও আপন মানুষগুলোর দেয়া বেদনা কেবল 'হতেই পারে' ভেবে ভুলে গিয়েছিলাম, ভুলে যেতে চাই সবসময়ে। তারা যদিও প্রায় সবসময়েই মধু দেন, তবু হঠাৎ করে দু'একদিন একটু বেদনা দিলেও তাদের বেদনা আমার কাছে মধু লাগেনি।

বাকি থাকে একটাই। একটা সম্পর্ক। তবে মনে হয়না সেই মানুষটা অকারণ "বেদনা" দিলে সেটা মধু হয়ে যাবে। বেদনা কোন খেলনা না, যে তা নিয়ে 'পিলো পাসিং' করা যেতে পারে। খানিক আগে বেদনা মধুর হয়ে যায় গানটা গুণগুণ করে গেয়ে আমার মনের ভিতরের শূণ্যতাটা যেন আরেকটু প্রকট হয়ে গেলো! বেদনাগুলো বুকের ভিতরে জমে জমে কেমন যেন দলা পাকিয়ে আছে। আজ বারবার মনে হচ্ছিলো, "কেন জীবনে এত কষ্ট আসে?" মাঝে মাঝে এই বেদনার দল মিছিল করে যেন, একের পর এক -- তারা ধেয়ে আসে অবিরাম। আমি অপেক্ষায় থাকি তাদের শেষ হবার দিনটার। আমি জানতাম, বেদনারা চিরস্থায়ী হয়না। তারা আসে এবং ভুগিয়ে চলে যায়। তাই অপেক্ষায় কেটে যায় বেলার পর বেলা, রাতের পর রাত...

আমার এই জীবন, এই চোখে দেখা শহর, এই মানুষগুলো -- কেউই তো স্থায়ী নই আমরা। এইতো জগজিত সিং চলে গেলো, করিম সাহেব, আনোয়ার সাহেবদের জানাযা পড়া হলো, কেউ বাস চাপায়, কেউ পানিতে ডুবে... সর্বত্রই বেদনা। আমার জীবনটাও গহন অন্ধকার হতে আলোর দিকে যেতে যেতে টিমটিমে আলো নিভে যেতে থাকে হঠাৎ। সম্ভাবনাগুলো সহসাই কেমন উধাও হয়ে যায় আর আমি হতাশ হয়ে যেতে থাকি। একটা চিন্তা মাথায় এসে মনে করায় -- জীবনে এই করেছি, ওই করেছি তবু এটা পাইনি, ওটা পাইনি। আমি এত খেটেও এসব পাইনি, অথচ মনির এরকম আনন্দ করেও সব পেলো। আরিফের বাবার অনেক টাকা ছিলো বলে ও পেরেছিলো কষ্ট না করেই অনেক কিছু অর্জন করতে... ইত্যাদি অমন হাজার চিন্তা। সবার মাথাতেই কমবেশি এগুলো আসে বলে আমার মনে হয়। কারণ আমার এই চিন্তাগুলো আমার মনের দুর্বল সময়ের চিন্তা-- সুযোগ পেলেই ধেয়ে চলে আসে।

এত যে বেদনার দল। কোন এক মনের উদ্ভূত কল্পনার মতন করে কাউকে পাওয়ার আশায় যে প্রেমিক পুরুষের দল, সমাজে প্রচলিত প্রেমের ছ্যাঁকায় ক্রমাগত প্রেম নিবেদনে বিরক্ত হতে হতে যে মানসী কন্য -- তাদের জীবনের প্রেমেই বুঝি সেই সংঘটিত "বেদনাখানি মধুর হয়ে যায়"?

আমি ইদানিং যখন এই বেদনায় ডুবে থাকি, তখন আমার কাছে হঠাৎ মধুর অনুভূতি হয়। সেদিন এক বক্তা ইয়াসমিন মোগাহেদের একটা আলোচনা শুনছিলাম। আমি সেদিন যেন পরিষ্কারভাবে চোখের সামনে অনেককিছু একবারে দেখতে পেলাম। আমি জানি, আমি জীবনে যখনই আমার নিজের পরিচয় ভুলে যেতে থাকি, তখনই অনেক বড় করে ধাক্কা খাই।

একটা প্র্যাক্টিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়ায় জীবনের শুরু থেকেই নামায আমার অভ্যাস হয়ে গিয়ছিলো। একবার টানা অনেকগুলো দিন কোন নামায পড়িনি। সেই ক'দিন নামাযবিহীন যাওয়ার পর প্রচন্ড ব্যাথা পেয়ে হাসপাতালে পড়ে ছিলাম। যখন বেডে শুয়ে নিজ জীবনের কথা ভাবছিলাম তখন মনে হয়েছিলো -- আমি আমার সবচাইতে প্রিয় যিনি, তাকে ভুলে যাচ্ছিলাম ক্রমাগত। আর তখন একটানা শুয়ে থাকার সময়টায় তার কথা বারবার বারবার স্মরণ হচ্ছিলো। তার দেয়া রাহমাত পেয়ে, প্রাপ্তিকে আপন গুণের অর্জন ভেবে অনেক সেলিব্রেশন পেয়ে আর অন্য অনেক রকম সম্পর্কে, মায়ায় বাঁধা পড়ে তার কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। যখন ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলাম তখন খেয়াল হয়েছিলো -- আমি কী ভীষণ একা! আর সেই সাথে আমি কী ভীষণ অকৃতজ্ঞ!

আল্লাহ আমাদের সমস্ত রূহদের সৃষ্টি করে প্রশ্ন করেছিলেন বিশ্বাল অ্যাসেম্বলিতে -- তোমাদের রব কে? আমরা সবাই উত্তর দিয়েছিলাম -- নিশ্চয়ই আপনি আমাদের রব। তারপর সেই রূহদের থেকেই সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি আমরা দল বেঁধে একের পর এক আসছি, আসবো। কিন্তু সবাইই সেদিন বলেছিলাম, চিনেছিলাম রব আমাদের কে। অথচ আমরা ভুলে যেতে থাকি আমাদের এই সম্পর্কটাকে। আমি টের পাই, আমি যখনই সবচাইতে প্রিয়জনকে ভুলে যাই, তিনি আমাকে একটা বড় ধাক্কা পাঠিয়ে দেন। আল্লাহ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন আমার মূল সম্পর্কটার কথা -- যাকে কেন্দ্র করেই এই আত্মা শান্তি পায়। যার কাছেই ফিরে যাবে সমস্ত আত্মারা, যার সাথে সম্পর্ক আমাদের সবচাইতে পুরোনো, যিনি আমাদের সবচাইতে আপন।

আমাদের এই শরীরটা হলো মাটির, এই পৃথিবীর মাটি দিয়েই যার নির্মাণ। তাই পৃথিবীর সম্পদ, পৃথিবীর আয়েশ, পৃথিবীর অপর মানুষরাই এই শরীরের খায়েশ নিবৃত্তির উপকরণ। জীবনভোর শরীরের খাবার জোগাড় করে বেড়াই আমরা। অথচ রূহ বা আত্মা -- যার সৃষ্টি সেই অপার্থিব পরিবেশে আল্লাহর পরম যত্নে -- তার খাবার তো আমরা দিইনা। আমার আত্মার যত্ন তো আমার স্রষ্টার অনুভবেই! তাকে ভুলে যাই, যখন আমার কাছে আমার নতুন মোবাইল সেটটি অনেক বেশি প্রিয় হয়ে যায়, যখন আমার সম্পর্কগুলোর প্রতি মোহ অনেক বেশি তীব্র হয়ে যায়, একটা সুন্দর বাড়ি-গাড়ির আকাঙ্খা অনেক বেশি হয়ে যায় -- তখন আমার কাছে অনুভব হয় আমার আত্মাটা যেন ভারী হয়ে পড়ে। কেমন যেন নিজেকে শেকড় কাটা মনে হতে থাকে। অথচ পরক্ষণেই সেই পুরোনো চক্রে চলে যাই -- অফিস, ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার, অ্যাম্বিশান, সম্পর্ক ইত্যাদি...

যেই আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন একদল বেদনা। সেই বেদনার দল আমাকে শুইয়ে দিলো বিছানায়। অথচ সবাইকে তিনি অমন করে বেদনার দল পাঠান না। যাদের তিনি ভালোবাসেন, তাদের একটা রিমাইন্ডার দেন বেদনা দিয়ে। কঠিন কষ্ট, কঠিন সময়ের ঝর্ণা বইতে থাকে তাদের জীবনে। অন্ততঃ কষ্টের সময়ে তাকে আবার পুনঃস্মরণ করে যদি সেই বান্দা ফিরে আসে তার দিকে পুরোপুরিভাবে! তাদের যিনি ভালোবাসেন, এই ভালোবাসার কারণেই তিনি কষ্টগুলো দিয়ে, বেদনাদের দিয়ে তার করা পাপগুলোকে ক্ষরণ করে দেন। সোনা যেমন পুড়ে খাঁটি হয় -- মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তিনি এই দুঃখ-কষ্ট, পার্থিব কিছু অপ্রাপ্তি, রোগ-শোক দিয়ে তার প্রতি ভালোবাসার আর্তিকে আরো শক্ত করে দেন, তাদের খাঁটি করে দেন। আর এই বেদনার মর্ম যারা বুঝতে পারে, তারা জানে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময় ব্যবধানের ৫০-৬০ বছরের জীবনের পরে আছে অনন্ত জীবন। সেই জীবনে আছে বেদনাহীন আনন্দের সময়।

একটা জিনিস ভাবলেই তো অবাক হয়ে যাই -- আমার স্নেহময়ী মা, আমাকে একটা থাপ্পড় দিয়েছিলেন যদি কোনদিন, আমাকে বুকে জড়িয়ে তার শতগুণ আদর দিয়েছিলেন। তাহলে কীভাবে আমাদের রব আমাদের এত "বেদনা" দিতে পারেন? আসলেই পারেন না। তিনি হলেন "গাফুরুল ওয়াদুদ" প্রেমময় আর পরম ক্ষমাশীল। তার দেয়া এই বেদনাদের মাঝে ডুবে থাকলে তাই তো আমার প্রার্থনাগুলো যখন চোখের পানি ঝরিয়ে অনবরত উচ্চারিত হতে থাকে এই ঠোঁট দিয়ে, জিভ নাড়িয়ে, বুকের ভিতরে যখন অনুভব হতে থাকে আমার খোদার বড়ত্ব আর বিশালত্বের ছায়া -- তখন বেদনার হাত থেকে রক্ষা পেতে তার সাহায্য চাই, আর চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে তার ভালোবাসাকে আলিঙ্গন করি। এই বেদনারা তাই মধুর হয়ে যায়।
বেদনা তখন মধুর হয়ে যায়,
বেদনা তখন মধুময় হয়ে যায়।

অজানিতেই হৃদয়ের তখন জেগে ওঠে সেই সুন্দরতম বাণী, যার স্মরণে হৃদয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে -- অজানা আর্তিতে, ভালোবাসায়, প্রার্থনায় আর কান্নায়...

"এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।" -- [সূরা বাকারাহঃ ১৫৫-১৫৬]