২৩ অক্টোবর, ২০১১

মুখে তোমার কতনা মধু

আমার ছোট একটা ভাতিজা আছে, সে প্রতিদিন একটা করে শব্দ উচ্চারণে চেষ্টা করে। সে যেদিন প্রথম "এই যেএএএ" আর "আবুউউউ" উচ্চারণ করলো -- সেদিন তার বাবা-মায়ের কিশোর-কিশোরীসুলভ আনন্দের উচ্ছ্বলতা দেখে আমি বিমোহিত হয়েছিলাম। সন্তান মুখে কথা বলবে -- এই জিনিসটা কতনা সুন্দর! আর বাবা-মা সেই দুআ করছিলেন দু'জনে একসাথে। এক বছরের কম সময় আগে পৃথিবীর বুকে আসা সেই শিশুটার মুখের শব্দে এত যাদু -- তা আমি একটু আগে একটা ঘন্টা কাটিয়ে বুঝলাম নতুন করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কী অপার রাহমাত।



সূরা আর-রাহমানের কথা মনে পড়ে গেলো। আল্লাহ তা'আলা এই সূরার প্রথমেই বলেছেন করুণাময় আল্লাহ, যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তারপরে বলেছেন যে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তার নিজের বাণী/নির্দেশ/আদেশ সংবলিত গ্রন্থটি শিখিয়েছেন মানুষকে, তিনিই মানুষকে কথা বলা শিখিয়েছেন যা আমাদের প্রতি তার অপার দয়া। যিনি সুন্দর করে কথা বলতে পারেন, তার প্রতি আমরা বিমোহিত হয়ে যাই। ছোট ছোট সন্তানদের প্রথম কথা বলার পর বাবা-মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে -- তার সন্তান কথা বলতে পারছে!! এ এক অপার করুণা আমাদের স্রষ্টার কাছ থেকে আমাদের প্রতি। ক-অ-অ-থা ব-অ-অ-লা -- কী এক দারুণ প্রাপ্তি আমাদের জীবনে, ভেবে কি দেখি কখনো? যিনি বোবা তার কতনা কষ্ট!


প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি আমরা, তারপর "আমার টাওয়েলটা কই" টাইপ কথা থেকে শুরু করে রাতের ঘুমাতে যাওয়ার সময়ে "লাইটটা জ্বালানো কেন এখনো" টাইপের কথার মাঝে আমরা পরিবারে, বন্ধুদের আড্ডাতে যা বলি তার কোনই গা করিনা। কী বলি বা না বলি -- এটা কখনই হিসেব করতে যাইনা বেশিরভাগ মানুষই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই! আমার বন্ধুদের মাঝে সকল বন্ধুমহলের মতই একটা ম্যানিয়া ছিলো -- কোডনেম বা টিজনাম দেয়া। কাউকে "বল্টূ", কাউকে "শশা", কাউকে "সুইয়ের আগা" টাইপের নামেও ডাকা হতো! বলাই বাহুল্য, যাদেরকে এই নামগুলোতে ডাকা হতো -- তারা বন্ধুমহলের সীমানা রক্ষার খাতিরে মৃদুপ্রতিবাদ বা হাসিমুখে সয়ে গেলেও কখনো না কখনো তার বিস্ফোরণ হতই। যে ছেলেটা বেশি ডাকতো তাকে একদিন রাস্তায় পড়ে থেকে কয়েকটা ঘুসি খেতে দেখেছিলাম কারণ সহ্য করতে করতে বেচারা প্রবল খেপে গিয়েছিলো আর তাই ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতের মতন করে ধরে শুইয়ে ফেলেছিলো মেরে। সমস্ত বন্ধু মহলেই টিজিং টাইপের ব্যাপারটা হয়ে থাকে।

অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন -- "মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করা হবে।" [১]

প্রতিটা ফ্রেন্ডসার্কেলে অনেকেই থাকে যারা অন্যদের পচায়া মজা পায়-- বিমলানন্দ যাকে বলে আরকি। কেউ হয়ত একটু ফর্সা, আবার কেউ হয়ত একটু বেশি কালো। কারো হয়ত চুল কোঁকড়া, কেউ হয়ত একটু উচ্চতায় কম, কেউ বেশি -- এমন হাজারো ব্যাপার নিয়ে ধলা, কালা, বাইট্টা, লাম্বা, কাঠি, বাঁশ, জিরাফ টাইপের শতশত নামকরণ করে/ডেকে স্মার্টনেস পায় অনেকেই। কেউ কেউ মনে করে এটা খুব সিম্পল একটা ফান -- এসব না বললে আবার ফ্রেন্ডের সাথে ফান করা হয়? অথচ আল্লাহ সূরা হুজুরাতেই বলছেনঃ

"হে ঈমানদারগণ, পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদের প্রতি বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। [২]

এই আয়াতের আলোচনা শুনছিলাম নুমান আলী খানের কাছে। উনি বলছিলেন যে আল্লাহ তা'আলা পুরুষ এবং মহিলাদের ব্যাপারটা আলাদা আলাদা করে উদ্ধৃত করেছেন। মহিলাদের বিদ্রূপের ঘরানা আর পরিবেশগুলো পুরুষদের তুলনায় প্রায় সময়ই ভিন্ন থাকে। মহিলারা হয়ত ঘরের বিষয়গুলো নিয়ে অন্যদের সাথে যখন কথা বলতে যান তখন স্বাভাবিকভাবে কিছু সূক্ষ্ম আর দূর্বল গুণের আলোচনা চলেই আসে -- অথচ স্বাভাবিকভাবে চলে আসা সেই আলোচনা যাকে নিয়ে হয় তিনি যথেষ্টই কষ্ট পান। তাই এই ব্যাপারগুলোতে মুসলিমাহ বোনদেরকে একটু খেয়াল রাখাও জরুরী।

একই আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেনঃ
"তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করোনা এবং খারাপ নামে ডেকোনা। " [৩]

এখানে আল্লাহ বিদ্রূপ করার কথা নিষেধ করতে গিয়ে বলেছেন "ওয়ালা তালমিযু আনফুসাকুম" -- যেখানে তালমিযু শব্দটা কাভার করে ক্ষুদ্র ইঙ্গিতগুলোও -- যেমন হয়ত একটা চোখ উঁচিয়ে কিছু ইঙ্গিত করা বা অস্পষ্ট করে কিছু বলা হলো যাতে হয়ত কোন শব্দ শোনা গেলোনা অথচ একজন ঠিকই বুঝলো তাকে এখানে বিদ্রূপ করা হচ্ছে। নুমান আলী খান তার আলোচনায় বলছিলেন -- কেউ যদি মন খারাপ না-ও করে, তবু তাকে ছদ্মনামে ডাকা ঠিক না। কেননা সেটা শত্রুতা সৃষ্টি করে। হতে পারে সে ক'দিন পরে খারাপ নামে ডাকবে আরেকজনকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "কোন মুসলমানের মান-মর্যাদার ওপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ করা হলো জঘন্যতম জুলুম।" [৪]

একটা পাপের জন্ম হয়ত আমরা একটা গালি বা একটা টিজ নাম দিয়ে ডেকে দিলাম। অথচ এর ফলে পরবর্তীতে সৃষ্টি হওয়া সবগুলো পাপই আমার একাউন্টে জমা হতে থাকবে। আখিরাতে ভাই তার অপর আপন ভাইকে দেখে পালিয়ে যাবে হিসাবের ভয়ে, আশঙ্কা করবে ভাই হয়ত তার কিছু চেয়ে বসবে। বন্ধু বন্ধুকে চিনবে না। কিন্তু বন্ধুর কারণে সৃষ্ট পাপের ভাগীদার আমাদের হতেই হবে।

আরেকটা কথা মনে পড়ে গেলো। একবার একটা হাদিসে পড়েছিলাম যেখানে অপর মুসলমানের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করা হয়েছিলো। যে অপর মুসলমানের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় আল্লাহ তাআলা তার দোষ-ত্রুটি খুঁজতে লেগে যাবেন এবং আল্লাহ যার ত্রুটি তালাশ করেন তাকে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন। এর চাইতে কঠিন আর ভয়ঙ্কর সময় আর কই যখন আল্লাহ স্বয়ং আমাদের ত্রুটি খুঁজে বের করবেন? আমাদের এই অভ্যাসটা একদম ত্যাগ করা প্রয়োজন। মনের ক্ষুদ্রতা ডিঙ্গিয়ে উদারতা অর্জনের জন্য অপরের ত্রুটিগুলো ওভারলুক করার অভ্যেসটা রপ্ত করা খুব দরকার।

আমাদের মধ্যে যারা জিহবাকে সংযত রাখতে পারবে তাদের জান্নাতপ্রাপ্তির ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা নিশ্চয়তা জানিয়েছিলেন। খুব হালকা শোনালেও এর ব্যাপকতাটা আমাদের উপলব্ধি করা খুব প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদের জিহবা সংযত রাখার তৌফিক দান করুন যেন আখিরাতের কঠিন হিসেবের সময়ে আমাদের মুক্তিলাভ হয়।

আল্লাহ আমাদের কথাবার্তা, লেখালেখির ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে কবুল করে নিন। বিশ্বজগতের অধিপতি, আমাদের প্রতিপালক আমাদের রহম করুন। আমিন।


**** নির্ঘন্ট ****
[১] সূরা হুজুরাতঃ ১০
[২][৩] সূরা হুজুরাতঃ ১১
[৪] আবু দাউদ
নুমান আলী খানের লেকচারঃ watch your tongue -- ইউটিউব লিঙ্ক

২টি মন্তব্য:

  1. হুম। আমি আগেও পড়েছি। এইসব নানান নামে মানুষকে ডাকা ঠিক না, কিন্তু আমাদের কাছে এগুলো এতই সহজ ব্যাপার হয়ে গিয়েছে যে কাউকে যদি বলি- কোরানে কিংবা ইসলামে এটা নিষেধ করা হয়েছে, তার কাছে বিষয়টা 'বাড়াবাড়ি' হয়ে যাবে !

    উত্তরমুছুন
  2. @মাসুদ ভাই,
    এই 'বাড়াবাড়ি' বোঝা/অনুভবের ব্যাপারটা আমার মনের স্কেলে না, বরং আল্লাহ ও তার রাসূলের স্কেলে হয় -- এটাই তো "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর বাস্তব স্বীকৃতি। আমরা যারা খেয়াল করিনি বলে ভুল করেছি, সেটা ভিন্ন কথা, আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তাওবা কবুলকারী। কিন্তু জানার পর নিজের ব্যাখ্যা দিয়ে বসে থেকে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে তার ফলাফল ভালো হবার কথা না।

    এই ব্যাপারটা অনেক ক্রুশিয়াল বা স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ ফিল করেই এই লেখাটা লেখা। আমার বদৌলতে যদি একটা মানুষও গুরুত্বটা অনুভব করেন -- সেটাই আমার লেখার স্বার্থকতা।

    উত্তরমুছুন

আপনার মূল্যবান মতামত জানিয়ে যান লেখককে