১১ আগ, ২০১৫

স্মৃতিময় স্মৃতিকাতরতা


তখন সন্ধ্যাবেলা
আঁধার ঘনিয়ে আসছিলো ক্রমেই। সারাটি দিন ছিলো বৃষ্টির বর্ষণ। শুধু যে বর্ষার বর্ষণ তা নয়, উত্তাল সমুদ্রের নিম্নচাপের প্রভাবও বটে। অপেক্ষাকৃত অচেনা পথে আনমনে হাঁটছিলাম, সামনের ভেজা পিচঢালা রাস্তা আর সন্ধ্যার আকাশ যেন মিশে গেছে চোখের সামনেই। হঠাৎ মাগরিবের আজান শুরু হলো কাছেই কোথাও। সুমধুর আজানের ধ্বনি, ঢাকায় এমন সুমধুর আজান সচরাচর কানে আসে না। উত্তর দিতে শুরু করতেই একটু পরেই কানে এলো আরেকটা কোথাও আজান শুরু হবার ধ্বনি। সহসাই মনে হলো, এরপর কোন মুফতি সাহেবের সাক্ষাৎ পেলে জেনে নিতে হবে এতগুলো মসজিদে আজান হলে কি একটার উত্তর দিলেই চলবে কিনা। পরে আবার মনে হলো, সেটাই তো হবার কথা, হয়ত কখনো শুনেছিলামও এমন মাস'আলা, কেন যেন স্পষ্ট মনে নেই এখন!


এদিক ওদিকের আজানগুলো বুকের মাঝে অদ্ভুত কিছু অনুরণন তৈরি করছিলো। আমার শোনা প্রিয় আযানের কথা [১] মনে পড়লো, তুরষ্কের একজন মুয়াজ্জিনের কন্ঠে অতিসুমধুর সেই ডাক। মনে পড়লো, তুরষ্কে তো গত শতাব্দীতেও মুসলিমদের খলীফাহ ছিলো, সেখানে ছিলো মুসলিমদের কেন্দ্র, অটোমান খিলাফত। এরপর তো কামাল পাশা এলো, পৃথিবীর বুকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো অন্তত নামে চলতে থাকা সেই খিলাফত। সেক্যুলার পৃথিবীর জয় মানেই শত সহস্র আলেমের মৃত্যু। সেই কস্তুনতুনিয়া/কনস্টান্টিনোপল/ইস্তাম্বুলে তো হাজার বছর ধরেই মুসলিমদের স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখা যেত। আজকের এই সন্ধ্যার মতই হয়ত অস্তমিত এই পৃথিবীর সর্বত্র মুসলিমদের সেই নেতৃত্ব।

"ওয়া রফা'না লাকা যিকরাক"-- সূরা ইনশিরাহতে আল্লাহ তো পৃথিবীর সুন্দরতম মানুষ মুহামাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন তার নামকে তিনি সম্মানিত করবেন। নুমান আলী খানের এক আলোচনায় [২] শুনেছিলাম, পৃথিবীর প্রতিটি মূহুর্তেই হয়ত কোথাও না কোথাও আযান হচ্ছে। মুয়াজ্জিনের কন্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ" -- এই আজানের শ্রোতারা সবাই দরুদ পড়ছে "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম"; সত্যিই আল্লাহ তার বন্ধুকে সম্মানিত করেছেন নানান উপায়ে। আজানও তো একটা!

আবারো মনে পড়ে গেলো সেই দিনটির কথা। বিলাল (রা) দাঁড়িয়েছিলেন আজান দিতে, প্রিয়নবীর নির্দেশে। সেই অদ্ভুত সুন্দর এক ঐতিহ্যকে আমরা ধারণ করে চলেছি প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কন্ঠে, কোটি কোটি প্রাণে। খেয়াল হলো, মুহাম্মাদ মুস্তাফার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুর পরে বিলাল আজান দিতে চাননি আর। অথচ অনেকদিন পরে তাকে অনেক অনুরোধ করার পরে তিনি যখন আবার আযান দিয়েছিলেন একবার, সবাই কাঁদতে শুরু করেছিলো স্মৃতিকাতর হয়ে। এই ইতিহাস জানতাম, হয়ত সেই সন্ধ্যায় প্রথম গভীরভাবে টের পেয়েছিলাম যে এই আজানের মাঝে কত শক্তি আর আবগে। এই আজানে আছে আত্মার অনুরণন।

কেন যেন স্পেনের কথাও মনে হলো। সেই স্পেন, সেই গ্রানাডা। সেই তারিক বিন যিয়াদ, মুসা বিন নুসাইর। কত শত বীর, কত লক্ষ লক্ষ সাহসী ঈমানের তেজোদীপ্ত জীবনের সিলসিলা ধরে আজ এই ক্ষুদ্র প্রাণের আমি এই পিচঢালা পথে স্মরণ করছি আল্লাহর নাম। সেই ইতিহাসের মাঝে রয়েছে লক্ষ-কোটি নাম-না-জানা প্রাণ যারা আল্লাহর জন্য জীবন কাটিয়েছিলেন। সেই স্পেনের মসজিদগুলোতে এখন আর আজান হয়না। কত অত্যাচারে তাদের যে হত্যা করেছিলো ক্রুসেডাররা, মরিসকো হতে বাধ্য হয়ে সামাজিকভাবে অধিকারবিহীন নির্যাতিত হয়ে কষ্ট পেয়ে জীবনকে বিদায় দিয়েছিলেন ভাইবোনেরা।

স্মৃতি কতই না তিক্ত, কতই না মধুময়। এই স্মৃতির সুতোর একপ্রান্তে গাঁথা সেই মক্কা আর মদীনা। আর তার স্পর্শ ধরে লক্ষ-কোটি প্রাণের ঘটনা। প্রতিদিন ৫ বার আযান ধ্বনি হয়। ক'বার অমন করে আমারই হৃদয় কাঁপায়? অথচ এই আযান ধ্বনি হয়ত এমন আরো অনেক কারণে আল্লাহর দেয়া একটি নিয়ম।অশ্রুসিক্ত হয়ে আজান শোনার হৃদয়কে প্রতিদিন ৫ বার করে ধারণ করতে ইচ্ছে হয়!


মাঝে মাঝে মনে হয়-- এত ছোট্ট এই হৃদয়, এত বিশাল ভালোবাসা-স্মৃতি-অনুভূতিকে কেমন করে ধারণ করতে পারবে!!

[স্বপ্ননগরী, ১১ আগস্ট, ২০১৫]

* * * *

[১] তুরষ্কের মুস্তাফা আইকানের কন্ঠের সুমধুর আযান : http://www.box.com/s/o2c3veqf3tg68trvpgqt
[২] নুমান আলী খানের আলোচনা [কাইনেটিক টাইপোগ্রাফি] : http://www.nakcollection.com/video-lectures/muhammad-saw-quran-gems