২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের ​ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে অনেক

​কমবেশি সবাই বুঝি, সময়ের সাথে সাথে ফেসবুক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিষয়ে ও ইস্যুতে কোন পক্ষের শক্তি বৃদ্ধি ও হ্রাস করতে মিডিয়া হিসেবে ফেসবুক কতটুকু সক্ষম সেটা গবেষণার বিষয় হলেও সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এর ভূমিকা যে অত্যন্ত বেশি তা প্রশ্নাতীত নিশ্চিত বিষয়।

আমি বলতে চাইছি, আমাদের আত্মিক বিষয়গুলোর কথা ভেবে আমাদের অত্যন্ত সাবধান হওয়া প্রয়োজন। নিজ স্পিরিচুয়ালিটি এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট করতে ফেসবুক এখন খুব ঠুনকো সহজ বিষয়। একদিকে যেমন অন্যদের খুশি করতে কিছু লিখলে তা আমাদের কাজকে আখিরাতের পুরষ্কারের পরিবর্তে শাস্তি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়, অন্যদিকে নিজ অসচেতনতায় লেখা আজেবাজে বিষয় ও শব্দ অন্যদের মনকে কলুষিত করলে তার দায়ভার আমাদের উপরেও বর্তাবে আখিরাতে। ফেসবুক অজস্র দাম্পত্য সম্পর্ককে নষ্ট-ধ্বংস-যন্ত্রণাবিদ্ধ করতে কাজ করেছে,করছে,করবে। সাবধান হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

অনেক সময় দেখা যায় অনেকে গাইর-মাহরাম মেয়েদের সাজুগুজু ছবিতে লাইক দিয়ে বেড়ায়। যদি কোন মেয়ের ফ্রেন্ডলিস্টে ছেলেরা থাকে, তাহলে সেই ছবিটা তাদের হোমপেইজে চলে যায়। সেই ছবি থেকে উদ্ভুত যত পাপ, সবই সেই লাইকদাতা মেয়েটির অ্যাকাউন্টে জমা হবে। কোন ছেলে যদি অন্যদের কাছে কোন গাইর-মাহরাম নারীর ছবি শেয়ার করে, তাদের সমস্ত পাপের দায় তার কাঁধে বর্তাবে এটা তো স্পষ্ট! আমার আন্ডারগ্র্যাডের এক ক্লাসমেট মেয়ে অনেকদিন আগে মরে গেছে কিন্তু তার হিজাববিহীন শাড়িপরা প্রোফাইল পিকচারওয়ালা একাউন্টটি যখন-তখন ক্লাসমেটদের সামনে হাজির হয়ে মনে করিয়ে দেয় সে আর নেই। কে জানে, এই ছবিটার হিসেবও হয়ত তাকে দিতে হচ্ছে। আল্লাহ মেয়েটির গুনাহ মাফ করে দিন, আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করুন।

আমরা জানি, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে নিজেদের যখন দেখতে সুন্দর লাগে তখন তা অন্যদের দেখাতেও আগ্রহবোধ করি আমরা। কিন্তু আমাদের এই সুন্দর শরীরটা কিন্তু বেশিদিন থাকবে না। যেদিন মরে যাবো, তার কয়েকঘন্টা পরেই তা পচতে শুরু করবে। এই ফেসবুকের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে হয়ত আমাদের ছবিগুলো রয়ে যাবে। আমরা যেন খেয়াল রাখি আমাদের এমন ছবি যেন ইন্টারনেটে ঘুরে না বেড়ায় যা আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের কাছে গুনাহ বয়ে নিয়ে যাবে।

এখনকার বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে অনেকের আগ্রহ মনে হয় ছবি তোলার জন্যই। শুধু বিয়ে না, যেকোনভাবেই সবাই কোন সুযোগ পেলেই হয়, সেজেগুজে ছবি তুলতে চায়। দমবন্ধ করা ছবি তোলার হিড়িক পড়ে কোন অনুষ্ঠানের মওকা পেলেই। ক'দিন আগে বাসে চড়ে ঢাকার বাইরে যাচ্ছিলাম, রাতের বেলাতেও কয়েকটা ছেলেমেয়ে বাসে বসেই তুমুল ছবি তুলছে। কোথাও বেড়াতে গেলেও মানুষ কেবল ছবিই তোলে। সেলফি তোলা, ছবি তোলা একটা নেশা। 'নার্সিসিস্ট' (narcissism) মানুষ যেন হয়ে না যায় আমাদের মুসলিম প্রজন্ম, আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন।

কোন ছেলে এবং মেয়ের যিনা (ব্যভিচার) করার গল্প নিয়ে ফেসবুক তোলপাড়ে যদি আপনার ভূমিকা থাকে, কে জানে হয়ত এসব বিষয়ে না জানা মানুষটাকে এই নোংরা গল্পটি জানানোর পাপের দায় আপনাকে নিতে হবে কিনা! ব্যভিচার করা দেশী-বিদেশি দেহপসারিনীরা কে কোথায় যাচ্ছে, সেই আলাপটা একটি নোংরা আলাপ। নির্লজ্জ বিষয়গুলোকে যেন আমরা সহজ করে না ফেলি। যে স্পষ্ট ব্যভিচারের আলাপ শুধু সবার মুখরোচক গল্প হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেটা আমাদের অন্তরকে আরেকটু দূষিত করা এবং একটি পাপের ঘটনাকে সামনে আনা ছাড়া কোন কাজ করছে না। আমাদের উচিত এমন বিষয়কে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলা।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুর পরেই আমরা মূলত দুনিয়ার শেষের দিকে ধেয়ে চলেছি। শেষ জামানায় অশ্লীলতা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়বে সেটা আমরা জানি। মুড়ি-মুড়কির মতন অবলীলায় মানুষ জাহান্নামকে কিনে নেবে নানান পাপে, নানান শির্ক করে। আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই ভয়াবহ সময়ে রক্ষা করেন। চলমান অশ্লীলতা যে আমাদের আখিরাত ধ্বংসকারী হতে পারে, শেষ জামানার তীব্র অশ্লীলতার অংশ হতে পারে, সে আশংকা যেন রয়ে যায় আমাদের বুকে। এগুলোতে জড়িয়ে হয়ত আমাদের আখিরাতটাই বরবাদ হয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এসব অশ্লীলতা এড়িয়ে চলাও কঠিন সবার জন্যই, কিন্তু নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিনতায় ভরা সৎকর্মগুলোর পুরষ্কার দেবেন অনেক অনেক বেশি। সেই পুরষ্কার ইনশাআল্লাহ আমাদের এ সময়ের কষ্টগুলো ভুলিয়ে দেবে।

আল্লাহ যেন আমাদেরকে যাবতীয় অশ্লীলতা-পাপাচার-সীমালঙ্ঘন থেকে হিফাজত করেন। ঈমানের উপরে থাকা যদি আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে না দেন, তাহলে আর কোন কিছুই নেই আমাদের জীবনকে সহজ করার। নিশ্চয়ই সমস্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর, আমরা সবাই তার অধম পাপী বান্দা। আল্লাহ আমাদের সিরাতাল মুস্তাকীমে পরিচালিত করুন।

[২২ ডিসেম্বর, ২০১৪]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত জানিয়ে যান লেখককে