৬ নভেম্বর, ২০১৪

চলে যাওয়া মানে এক অদ্ভুত জগতে পদার্পণ

​জানি একদম সবকিছু ছেড়ে চলে যাবো একদিন। বিদায়টা সাহিত্যের শব্দালংকারের ঝংকারে মাতানো মিষ্টি কোন অনুভূতির মতন মতন না। বিদায়টার সাথে আমার শীতের ঘাসের উপরের স্নিগ্ধ শিশির কিংবা পূর্ণিমা রাতের জোছনার বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার মতন না। বিদায়টা কঠিন, অনেক কঠিন। ইদানিং একে-একে বিদায় নেয়া অনেকের মৃত্যুর কথা শুনে শ্বদন্ত বের করে কথা বলা মানুষগুলোর নির্বিকারতা দেখে মাঝে মাঝে বিষ্ময়ের মাঝে হারিয়ে যাই; শীতল শিহরণ বয়ে চলে আমার শরীর জুড়ে, মেরুদন্ড বেয়ে। মৃত্যুকে আমি ভয় করি। ভয়হীন এই মানুষগুলো কি মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে কি খুবই আত্মবিশ্বাসী? নাকি তাদের কাছে সেগুলো মূল্যহীন? নাকি তারা চিন্তা করতেও অনাগ্রহী এবং বেখবর? জানিনা আমি...


জানি প্রতিটি মানুষের মতই আমাকেও যেতে হবে। চলে গেছেন দাদাজান, চলে গেছেন নানাজান। তারাও একদিন আমার মতন আধো শীতের সকালে হয়ত লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থেকে প্রিয়জনের হাতের উষ্ণতা পেতে পছন্দ করতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাদাজানের স্নিগ্ধ কুরআন তিলাওয়াত আমার কাছে মধুর চেয়ে মিষ্টি লাগতো। একদিন তিনিও চলে গেলেন তার অবধারিত গন্তব্যে। এভাবেই চলে গেছে এক সহপাঠি যে একদিন আমারই মতন শেষ এক্সাম দিয়ে ফিরে চিৎকার করে রুমে ঢুকে বন্ধুদের সাথে হাসতে হাসতে আনন্দ করেছিলো। চলে গেছে সহপাঠিনী যে কঠিন ল্যাব ক্লাস শেষে বের হয়ে এসে আশেপাশের ক্লাসমেটদের টেনশনে বলছিলো, "এবার কি এই কোর্সে পাশ করতে পারবো?" সেই কোর্সে পাশ করেছিলো কিনা মনে নেই, তবে গ্র্যাজুয়েশন হয়েছিলো ঠিকই। জীবনের কোর্সটাও তার শেষ। আখিরাতের পাইপলাইনে ওর জীবন চলে গেছে ইতোমধ্যেই... নানান অভিজ্ঞতার, নানান হিসেবের ভয়াবহ সময়গুলো কেমন করে পার হচ্ছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।

মালাকুল মাওত তার কর্মে খুবই নিপুণভাবে সময়ানুবর্তী। তালিকায় নাম এলে তিনি হাজির হন, একদম নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত মূহুর্তে, নির্দ্বিধায় রূহ নিয়ে বিদায় নিইয়ে দেন মানুষের দুনিয়ার জীবনকে। এই আমি চোখ দিয়ে হয়ত এখন দেখছি এই কম্পিউটার স্ক্রিনে ভাসতে থাকা আমার লেখা বাক্যগুলো, যার একেকটি অক্ষর আমার বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা আমার ভালোবাসা ও অনুভূতিগুলোর প্রতিরূপমাত্র। এমন অনেক ভালোবাসা আর কৃতকর্মের ছাপ রেখে চলেছি দুনিয়ার এখানে, ওখানে... এ হৃদয়ে, সে হৃদয়ে। অথচ মৃত্যু আসা মাত্রই আমি এর পরিবর্তে দেখতে শুরু করবো ভিন্ন এক জগত। এখানে আর আমার চিহ্নও রইবে না। সকলের স্মরণ থেকে হারিয়ে যেতে লাগবে অল্প ক'টা দিন মাত্র।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আচ্ছা, যারা চলে যায় তাদের অনুভূতিটা কেমন হয়? যারা শতবর্ষী, শেষ বয়সে মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গোণেন, তারা হঠাতই একদিন মালাকুল মাওতের দেখা পান। রূহটা বেরিয়ে যায় কষ্ট দিয়ে, তীব্র কষ্ট। এরপরের সেই যাত্রা, রূহ উর্ধাকাশে উঠতে থাকে এই আসমানে, ঐ আসমানে... শেষমেষ সেই কবরে ফেরত আসে। মুনকার নাকীরের ভয়াবহ দর্শন আর প্রশ্নোত্তর পর্ব... পারবো কি? এরপরে কি চারপাশ থেকে আমাকে চেপে ফেলবে? আমি তো আরামে ঘুমিয়েছি সারাটি জীবন। আমি কী পারবো কবরের চেপে ধরা কষ্ট সহ্য করতে? আমি কখনো খুব একা থাকিনি। একা লাগলে ভার্সিটি লাইফে ঘুরে বেড়াতাম এই রুম-ঐ রুমে, চায়ের দোকানে, ক্যাফেটেরিয়ায়, লাইব্রেরিতে গল্পসল্প করে। বাসায় ফিরে আম্মা বা বোনের সাথে আলাপ করে ব্যস্ত রেখেছি তাদের। কবরে একা থাকতে হয় বছরের পর বছর। আমি কি পারবো সেই তীব্র একাকীত্ব সহ্য করতে? চিন্তা করতে গিয়ে ফিরে আসি। পানাহ চাই আল্লাহরকাছে, আমাকে এই নিয়ামাতভরা জীবনে যে কষ্টগুলো তিনি দেননি, সমস্ত সময় যেভাবে সাহায্য করেছেন; আখিরাতেও তিনি আমাকে ও আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের রক্ষা করবেন ইনশা আল্লাহ। জানি আমরা পাপিষ্ঠ, জানি আমরা অকৃতজ্ঞ, না-শোকর বান্দা। কিন্তু যার কাছে সাহায্য চাই, ভিক্ষা চাই তিনি তো রাজাধিরাজ, তিনি আল-গাফুর, আর-রাহীম, আল-ওয়াদুদ; আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের অশ্রুসিক্ত কান্নাগুলোকে ফেলে দেবেন না।

সেই অনন্তকালের যাত্রায় তেমন কিছুই অর্জন করতে পারিনি তা বুঝি। কল্পনাতীত নিয়ামাতের বিপরীতে আমার শুকরিয়া জ্ঞাপনের কথা ভেবেও নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ লাগে। যত যা-ই হোক, এই হাত-পা, চোখ-মুখ, সুস্থ শরীরে একটি বিকেল-সন্ধ্যা কাটানোর পরেও যদি নিয়ামাত বুঝতে না পারি তাহলে কেমন করে হবে? মৃত্যুর চিন্তা আমাকে চিনিয়ে দেয় নিজের ক্ষুদ্রতা, অসহায়ত্ব ও অপরিণামদর্শী জীবনের কথা। অজানা আশঙ্কায় ভীত হয়ে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে প্রায়ই--

"আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন আযাবাল কাবর, ওয়া মিন আযাবি জাহান্নাম... ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া-ই ওয়াল মামাত"...

* * * *
১১ মুহাররাম, ১৪৩৬ হিজরি
০৫ নভেম্বর, ২০১৪ ঈসায়ী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত জানিয়ে যান লেখককে