২৫ ফেব, ২০১৬

কে মাথা নোয়াতে জানে না? কে?


আমরা যখন একদম ভুলে যেতে থাকি, ডুবে যেতে থাকি নিজেদের ক্ষমতা, সামর্থ্য, ষড়যন্ত্র, উদাসীনতার অদ্ভুত মোহে, তখন আল্লাহ একটা নাড়া দিয়ে দেন। ঝকঝকে আকাশ হঠাৎ কেমন অন্ধকার হয়ে গেলো, কেমন রুদ্র ঝড় ঘিরে ফেললো চারপাশ, কেমন শিলা বৃষ্টির ঠাস ঠাস আঘাতগুলো জানালার কাঁচে, শার্সিতে, গাড়ির ছাদে, গায়ের উপরে আঘাতের মতন হয়ে আমাদের সত্ত্বায় নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো। আমরা কি আদৌ অনুভব করতে পারি? আমরা কি পারি উপলব্ধি করতে? কেমন শিউরে উঠেছিলাম আমরা কেউ কেউ!

আমরা যখন কথা বলি, তখন আল্লাহকে মনেই রাখিনা। শ্রেষ্ঠ আর প্রিয়তম যেই মানুষ, তাকেও আল্লাহ শিখিয়েছিলেন "ইনশাআল্লাহ" বলতে, অর্থাৎ আল্লাহ যদি চান তবেই না হবে! ঝড়-ঝঞ্চার মতন দুই-একটা ঘটনায় তো গোটা কাজই তো বন্ধ হয়ে যায়। অথচ একটা ঘটনা না ঘটার হাজার হাজার উপলক্ষ থাকে যার কিছুই আমাদের হাতে নয়। তবু আমরা বুঝিনা আমরা অহংকার করি, আমরা অতিরিক্ত দম্ভ দেখাই।

'কেউ রুখতে পারবে না', 'করেই ছাড়বো', 'দেখিয়ে দিবো', 'বুঝিয়ে ছাড়বো'-- এমন কত বক্তব্য! কেউ কেউ বলে, অমুক নাকি মাথা নোয়ায় না কারো কাছে, আবার কেউ বলছি ও মাটি তোমার তরে ঠেকাই মাথা। শুধুই কি আলংকারিক মাথা নোয়ানো? আমরা নতজানু হয়ে, মাথা নুইয়ে দিই বৃষ্টিতে, ঝড়ে, সূর্য আর চাঁদের গ্রহণেও! আমরা মাথা নোয়াতে জানি, মাথা নোয়ানো ভুলতে জানিনা।

তোমার তরে এমনভাবে মাথা ঠেকানোর জন্য কবুল করে নাও প্রভু, যা তোমায় খুশি করবে, আমাদের মুক্তি দেবে!

[২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬]

২০ ফেব, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৫২

 

(৪৭০)
জীবন স্রোতে আমরা বয়ে চলি। আল্লাহ আমাদের তার ইচ্ছেমতন আয়ু দেন, আমরা নানা উপায়ে তা ব্যবহার করি। বিভিন্ন সুযোগে, বিভিন্ন সময়ে আমরা বিভিন্ন কাজে মন দেই। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের চাওয়া অনুযায়ী জীবনে খুব কম কাজই আমরা করতে পারি। আল্লাহ চাইলে না চাওয়া কাজও করে ফেলি, আল্লাহ না চাইলে হাজার চাইলেও কিছু করতে পারিনা।

(৪৭১)
হাল ছেড়ো না বন্ধু। এই হাল না ছাড়াই তো জীবন। এই জীবন সমদ্রের পুরোটাই তো উত্তাল ঢেউ। হাল ছাড়ার কিছু নেই, দিগন্ত দেখারও কিছু নেই। যারা মনে করে হাল ঠিকই আছে, ধরে ফেলেছি-- তারাই ডুবন্ত। তাই ধরে থাকো হাল। লেগে থাকো।

(৪৭২)
আমরা জীবনে যা করি, যা অর্জন করি, যা অভুতপূর্ব জিনিস শিখি-- সব আমাদের মাঝেই ছিলো, থাকে। সময়ে সময়ে আমরা উপলব্ধি করি। কিন্তু সেই উপলব্ধি করতে একটা 'জার্নির' মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাওলো কোয়েলহো আলকেমিস্টে এই ব্যাপারটা বুঝিয়েছে। একটা অভিজ্ঞতার আগে-পরের আমরা একই মানুষ না। একই জিনিস আমাদের ভিন্নভাবে ধরা দেয়, দেখার চোখ বদলায়। অভিজ্ঞতা খুব খেলো কিছু না। তাই, যত তিক্ত হোক, অভিজ্ঞতার তুলনা হয় না। নিজের ভেতরেই যা ছিলো, তাকেই নতুন করে খুঁজে পেতেই আমরা ছুটে বেড়াই পৃথিবীর এই প্রান্তর থেকে অন্য প্রান্তরে।

সময়ের সাথে সাথে পৃথিবী যতটা বদলায়, দেখার চোখটা তার চেয়ে অনেক বেশিই বদলায়...

(৪৭৩)
আপনার কি মনে পড়ে শেষবার যখন মনে হয়েছিলো এই কষ্ট আর আপনি সহ্য করতে পারবেন না! আপনি পেরেছেন, এখনো পারবেন, আগামীতেও পারবেন। তাই অধৈর্য হয়েন না, আশাহত হবেন না।

১৯ ফেব, ২০১৬

রুমী কবিতা (উনবিংশ কিস্তি)

 

* * * * * *
আত্মাকে শোনার ক্ষমতা দিয়ে যে কান দান করা হয়েছে তা এমন কিছু শুনতে পায় মন যা বুঝতেও পারে না।~জালালুদ্দিন রুমী

* * *  * * *
অন্যদের জীবনের ঘটনাগুলো কেমন করে ঘটেছে, অন্যদের গল্প শুনে সন্তুষ্ট হয়ে যেয়ো না। নিজ জীবনের লুকিয়ে থাকা কল্পকাহিনীর পর্দা উন্মোচিত করো।~জালালুদ্দিন রুমী

* * *  * * * 
তোমার হৃদয়টাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ভাঙ্গতে থাকো যতক্ষণ পর্যন্ত তা না খুলে যায়।~জালালুদ্দিন রুমী

* * *  * * *
তুমি যা ভালোবাসো, সেটাই তো তুমি। ~জালালুদ্দিন রুমী

* * *  * * *
খোদাকে এমনভাবে স্মরণ করো, যেন তোমার নিজেকেই ভুলে যাও। যাকে স্মরণ করা হচ্ছে আর যে স্মরণ করছে, তারা উহ্য হয়ে যাক; তুমি মিশে যাও খোদার স্মরণের মাঝে। ~জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
এমন একটা  গোপন ঔষধ আছে যা শুধু তাদেরকে দেয়া হয় যারা এতটা বেশি আহত হয় যে তারা আর আশা করতে পারে না। ~ জালালুদ্দিন রুমী


* * * * *
মরে যাওয়া আর চলে যাওয়ার মাঝে অনেক পার্থক্য। সূর্য অস্ত যায়, চাঁদ ডুবে যায় ঠিকই। কিন্তু তারা তো আর চলে যায় না। ~জালালুদ্দিন রুমী


* * * * *
তুমি আমার পথ,
তুমিই আমার গন্তব্য।
আর কিছু বোলো না।

~জালালুদ্দিন রুমী

১৮ ফেব, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৫১

 

(৪৬৭)
বড় হবার পর থেকে যে জিনিসটা খুব খুব ইচ্ছে হতো, তা হলো-- সবকিছু ভুলে কবে আবারো নিশ্চিন্তে বইতে ডুব দেবো। ঠিক ছোটবেলার মতন... স্বপ্নালু চোখে লেখকের লিখে যাওয়া পৃথিবীতে আমি প্রবল ভালোবাসা আর কল্পনার প্রখরতায় মনে আঁকবো লেখাগুলোর প্রতিটি দৃশ্যপট। পাঠক হবার জন্যও পৃথিবীটা খুব ছোট! চাকুরি আর দায়িত্বের বোঝা নিয়ে দিনগুলো ক্ষয়ে যায়। অথচ পড়ার ছিলো অনেক কিছু। অদ্ভুত হাহাকার লাগে! কত মানুষের কত বৈচিত্র্যময় জীবন। কূপমণ্ডূকদের মতন নিজ জগত নিয়ে মিথ্যে অহং, জান্তব ঔদ্ধত্য থেকে বেরিয়ে আসতে বইয়ের মতন দুঃসাহসী ও বিশ্বাসী বন্ধু আর কে আছে? যে পড়ে আর যে পড়ে না, তারা কি কোনোদিন সমান হতে পারে? কক্ষনো না। কোনভাবেই না!

আমাদের রব আমাদের যতটা জ্ঞান দিয়েছেন, ততটুকুই আমাদের জানা; তিনি যা শেখাননি, তার কিছুই আমরা জানিনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী।

(৪৬৮)
মানুষ বদলায়, খুব বদলায়। সময়ের সাথে সাথে বদলায় রুচি, দেখার চোখ, অনুভবের হৃদয়। পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নেয়াই নয়, তাকে অভিনন্দিত করতে না পারলে আমরা পরাজিত হবো। মন্থর থাকা স্রষ্টার সৃষ্টির কোথাও নেই। গাছের পাতা বদলায়, রং বদলায় আকাশের, ভালোলাগা-মন্দলাগা বদলায় মানুষের হৃদয়ের, বদলে যায় নদীর গতিপথ, ছায়াপথ, নীহারিকা, নক্ষত্রালোক, মায়াবী রাতের ক্ষণগুলোও... থেমে থাকেনা আমাদের আয়ু, জীবনকাল। তাই ভাংগা গড়ার এই জীবনের পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নেয়াতেই উপায়...


(৪৬৯)
একজন জ্ঞানী মানুষের কাছে এসে এক ব্যক্তি বলেছিলো,
- আমি তো খুব ক্ষুদ্র, আমি যতই আন্তরিক চেষ্টা করি না কেন, আমি কি আদৌ কোনো পরিবর্তন করতে পারবো কিছু?

জ্ঞানী মানুষটি বলেছিলেন,
- ক্ষুদ্র কিছুর শক্তি নেই বলছো? তাহলে অন্ধকার রাতে মশার সাথে কাটিয়ো, বুঝবে ক্ষুদ্র হলেও ডেডিকেটেড থাকলে কেউ কতটা শক্তিশালী!

১৭ ফেব, ২০১৬

শান্তিতে থাকার জন্য ভালোবাসতে হয়

 শান্তিতে থাকার কিছু সার্বজনীন উপায় আছে, তা মেনে চলতেই হয়।

হৃদয়ের ভেতরটা ফাঁকা করতে পারেন? যেমন ধরুন, কারো খারাপ ব্যবহার, অন্যায়গুলোতে আহত হয়ে না থাকা? অথবা ধরুন, নিজের ব্যর্থতা, অসুস্থতা, অসহায়ত্বে ভারাক্রান্ত হয়ে আছেন?

নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন না? নিজেকে মুক্তি দিন। ছাড় দিন। সমস্ত প্রত্যাশা থেকে নিজেকে দয়া করে ছাড় দিন। গ্রহণ করেই নিন যা হয়েছে। চেয়ে দেখুন, পৃথিবীটা অনেক বড়, লক্ষ-কোটি মানুষ এতে। আপনার মতই সবারই অনেক অপূর্ণতা-যন্ত্রণা-কষ্ট-না পাওয়ার বেদনা। আপনি যা চাইছেন, তা পেয়েও অনেকে শান্তিতে নেই। আমি এত ভাবতেও হবে না, স্রেফ নিজেকে ছাড় দিন সমস্ত জিঞ্জির থেকে।

পারবেন না লোকের খারাপটা নিয়ে আলাপ না করে থাকতে? আপনার আত্নীয় যিনি, তার ক্ষুদ্রতা নিয়ে সমালোচনা না করে থাকতে পারবেন না? মানুষ তো আপনার পছন্দের হতে পারবে না। পছন্দ-অপছন্দ আপনার মনের ব্যাপার। আপনি যাকে অপছন্দ করেন, সে কিন্তু অনেকের পছন্দের ব্যক্তি হতেই পারে। আসলে, পছন্দ আপনি করছেন কারণ আপনি যা চিন্তা করেন, সেটা আপনারই তৈরি। আপনার ভালোলাগার কারণ আপনিই, আপনার অনুভূতির মূল প্রকৌশলি আপনি নিজেই।

ভালোবাসতে পারবেন না এখন সবকিছুকে? তুচ্ছ মানুষগুলোকে ভালোবাসুন। আপনি যখন ভালোবাসতে পারবেন, তখন বুকের ভেতরে বসন্তবাতাস অনুভব করতে পারবেন। ভালোবাসতে পারার মাঝে আছে শান্তি। কিন্তু যতক্ষণ আপনি অন্যদের প্রতি ঘৃণা করা থেকে, নিজেকে তাদের চেয়ে উচ্চমানের মানুষ মনে করা থেকে, খুঁতখুঁতানি স্বভাবে অশান্তিতে থাকা থেকে বাঁচতে না পারবেন-- আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত ভালোবাসতে পারবেন না।

যে ভালোবাসতে পারে না, সে বেদনাক্লিষ্ট ও দুর্বল মানুষ। ভালোবাসুন, দয়া করুন। উপেক্ষা করুন নেতিবাচকতাগুলোকে। কারো খুঁত আর ভুল খুঁজতে চাইলে ভালোবাসা যায় না। মানুষ ভুলে ভরা প্রাণী, অন্যায় আর অপরাধে ডুবে থাকা প্রাণী। তাকে ভালোবাসতে পারার মূল কারণটা আপনার হৃদয়। কাউকে ভালোবাসার কৃতিত্ব কেবলই আপনার।

হৃদয়কে মুক্ত করুন সমস্ত জিঞ্জির থেকে, সমস্ত অশান্তি ও অতৃপ্তির জাল থেকে, সমস্ত ঘৃণার কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে থাকার অসহায়ত্ব থেকে। হৃদয়কে শান্তি দিন, নিজেকে ক্ষমা করুন, নিজের নেতিবাচক, ঘৃণাবাচক, অশান্তিময় চিন্তাগুলোকে উপেক্ষা করুন। চেষ্টা করুন নিজ ভালোবাসাটা চারপাশে ছড়িয়ে দেয়ার। কারণে ভালোবাসুন, অকারণে ভালোবাসুন। যখন আপনি ভালোবাসতে পারবেন-- ভালোলাগায় আপনার চোখ ভিজেও আসতে পারে! হৃদয়ে শান্তির পরশ পেতে, বুকে বসন্ত বাতাসের স্পর্শ পেতে সমস্ত ভার ফেলে দিয়ে, ঘৃণা ফেলে দিয়ে, ভালোবাসুন।

ভালোবাসার মাঝেই রয়েছে জীবনের এক গভীরতম দর্শন।

[১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬]

৩ ফেব, ২০১৬

[অনুবাদ] পাওলো কোয়েলহো # ২

 




* * * * * * * *
যাদুতে এবং আমাদের জীবনে শুধু একটা জিনিসই বর্তমান, তা হলো-- এই মূহুর্তটি।

আপনি সময়কে কখনো দুইটি বিন্দুর দুরত্বের মতন করে মাপতে পারবেন না, সময় কখনো দুরত্ব পার হয় না।

আমরা মানুষরা বর্তমানের উপরে মনোযোগ দিতে সীমাহীন সংগ্রামের মধ্যে থাকি। কেননা, আমরা চিন্তা করতে থাকি আমরা কী করেছিলাম, কী করলে আমাদের অতীতটা আরো ভালো হতে পারতো, কী কী করে ফেলার কারণে আমাদের জীবনের এই অবস্থা, যা করার দরকার ছিলো, সেটা আমরা কেন করিনি....

~ পাওলো কোয়েলহো

* * * * * * * *
স্বপ্নের পেছনে ছুটে চললে কিছু মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্যটি হতে পারে আমাদের কিছু অভ্যাসকে পরিবর্তন করা, হতে পারে এর ফলে কিছু কষ্টসাধ্য কাজের মধ্য দিয়ে যাওয়া, অথবা হতে পারে চেষ্টার পরেও আশাহত হওয়া। স্বপ্ন দেখা যতই চড়া মূল্যের লোকসানের কাজ হোক না কেন, যারা স্বপ্ন দেখেনা তাদের লোকসানের তুলনায় স্বপ্নচারীদের লোকসানের তুলনাই চলে না। ~পাওলো কোয়েলহো


* * * * * *
অনেক সময় আমরা যে জীবনধারায় চলছি সেভাবে সেভাবেই চলতে এতটাই মত্ত হয়ে থাকি যে অনেক সুন্দর সুন্দর সম্ভাবনাকে আমরা প্রত্যাখ্যান করে ফেলি তা স্রেফ এই কারণে যে আমরা জানিনা সে সুযোগ দিয়ে কী করা যেতে পারে।~পাওলো কোয়েলহো

 * * * * * *
সোজা রাস্তায় দক্ষ চালক গড়ে ওঠে না। ~ পাওলো কোয়েলহো

* * * * * *
কুঠার ভুলে যায় আঘাতের কথা, গাছ তা ভোলে না। ~ পাওলো কোয়েলহো
 

২ ফেব, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৫০

 

(৪৬৪)
যে জিনিস আমরা বুঝিনা, তার প্রশংসা আমরা করিনা, তাকে আমরা ভালোবাসিনা। যে জিনিসের মর্ম আমরা বুঝিনা, তার প্রতি আমাদের মুগ্ধতা আসে না, আমরা আকর্ষণ অনুভব করিনা।

কোনো কিছু আমরা ভালোবাসিনা, পছন্দ করিনা তার মানে এটা কখনই না যে তা আসলে অমূল্যবান, অসুন্দর। মূলত আমাদের অনুভূতি আমাদের বোধের উপরে নির্ভরশীল।যা কিছু আমাদের বোধের সীমানায়  থাকে না, সে তো সুস্পষ্ট অনাকর্ষণীয়ই বটে!

(৪৬৫)
ভালোবাসা পাওয়ার সূত্র জানতে চান? সেটার ক্ষেত্রে হয়ত অনেকগুলো বিষয় থাকতে পারে, আছেও। তাই সে হিসেব লম্বা কলেবরের হবে। তবে ঘৃণার সূত্র খুব সরল। আপনি ভালোবাসলেই যে বিনিময়ে ভালোবাসা পাবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে ঘৃণা করলে তার বিনিময়ে কোনোদিন ভালোবাসা পাবেন না, তা নিশ্চিত। ঘৃণার বিনিময়ে কেবল ঘৃণাই পাওয়া যায়। ঘৃণা করে ভালোবাসা, যত্ন আর উত্তম আচরণের আশা কেবল মূর্খরাই করে। মানুষ শুধু নয়, পশুপাখিরাও ভালোবাসার অনুভূতি টের পায়। মুখের শব্দ দিয়েই কেবল আবেগের আদান-প্রদান হয় তা নয়। ভালোবাসার আলাদা তরংগ আছে যা সরাসরি হৃদয়কে আলোড়িত করে। ভালোবাসা আর ঘৃণার অনুভূতি মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পারে।

(৪৬৬)
আপনি সারাদিন যা চিন্তা করবেন, পৃথিবীটা আপনার অমন মনে হতে থাকবে। আপনি যদি বিকৃত চিন্তা করতে থাকেন, আপনি দেখবেন চারপাশে অনেক বিকৃত মানুষ। এমনকি আপনার সাথেও সবাই বিকৃত আচরণ করছে। আপনার পৃথিবীটা আপনারই প্রতিবিম্ব। যারা নোংরা, তারা নিজের নোংরামিটাই খুঁজে পায় অন্যের মাঝে। সবার মাঝের নোংরা বিষয় নিয়ে কথা বলা, অন্যদের গায়ে কালিমা লাগানো, গীবত করা, সম্মানিতদের বেইজ্জতি করতে চাওয়া মানুষগুলো মূলত অহংকারী আর বেয়াদব, শয়তান তাদের চালকের আসনে থাকে। ধ্বংস করতে বিশেষ কোন গুণ থাকা লাগে না। আপনি সৃষ্টিশীলতার চেষ্টা না করলেই আপনি প্রবল ধ্বংসকারী হয়ে যেতে পারবেন।

সৃষ্টি করা সহজ কাজ নয়। সৃষ্টি করতে হলে একটা মানুষের নিজের ভেতরে শতবার ভাংতে হয়। নিজেকে বিলিয়ে, তার জ্বালা সহ্য করে মানুষ সৃষ্টি করে যেকোনো কিছু। ভালো মানুষেরা পারে অন্য মানুষের ভেতর থেকে ভালোটুকু বের করে আনতে।ভালো মানুষ পারে অন্যদের মাঝে আলো জ্বালাতে। ঠিক এই মূহুর্তেও আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এই ভেবে যে আপনি সৃষ্টিশীল, সুন্দর চিন্তার কবেন নাকি কদর্য কুৎসিত সমালোচনাকারী হিসেবে নিজের অহংকারকে জারি রাখবেন। হৃদয়কে ভারমুক্ত করুন, নিজের নোংরা, কুৎসিত, কদাকার চিন্তাগুলোর চাষাবাদ না করে ভিন্ন কিছু করুন। কোনো ভালো কিছু করতে না পারলেও, খারাপ কিছু না করে থাকুন। খারাপ কিছু না করাও তো একটা ভালো কাজ, তাইনা?

২৩ জানু, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৪৯

 

(৪৬২)
জীবনটা স্বপ্নের মতন। চোখের সামনে যত অস্থিরতা, অশান্তি, উদ্বিগ্নতায় আপনি ডুবে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন-- এগুলো সবই ক্ষণস্থায়ী। জীবনের কোনো দুঃখই যেমন দীর্ঘস্থায়ী নয়, আনন্দগুলোও তেমনি। চোখটা বন্ধ করে চিন্তা করে দেখুন, ১০-১৫-২০ বছরের পুরোনো সময়গুলোকে আপনার মনে হবে অল্প ক'দিন আগের মাত্র! এর মাঝে পৃথিবী খুবই বদলেছে, আপনার জীবনটাও। কিন্তু জীবনের অনুভূতিগূলো একই রকম আছে। সেই দুশ্চিন্তা, কষ্ট-বেদনা, হাহাকার, স্বপ্ন। হয়ত বিষয়বস্তু বদলেছে, কিন্তু জীবনের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটুকুর মতই আপনার জীবন।

ভেঙ্গে পড়বেন না, খুব বেশি চিন্তায় হারিয়েও যাবেন না। জীবনটা আল্লাহর দেয়া একটা উপহার। বিশ্বাস করুন, আপনি যতই কষ্ট পেয়ে অস্থির হয়ে যান না কেন, আল্লাহ ঠিকই এই সময়ের শেষে একটা সুন্দর সমাধান রেখেছেন। আপনি যতদিনে সেই কষ্টটা সামলে উঠবেন, ততদিনে নতুন কিছু এসে হাজির হবে, হতেই হবে। এটাই দুনিয়া।জান্নাতে পা দেয়ার আগ পর্যন্ত এই উথাল-পাথাল কষ্টের মাঝে বেঁচে থাকাই জীবন। ছেড়ে দিন সব ধরণের আশা। আল্লাহ যা আপনাকে উপহার দিচ্ছেন প্রতিদিনের জীবনে, মেনে নিন। মেনে নিয়ে বর্তমানকে সাজিয়ে তোলার চেষ্টাটার মাঝেই রয়েছে জীবনে সুখী থাকার এক নির্যাস।

(৪৬৩)
আমরা কত শত ক্ষুদ্র স্মৃতি ধরে রাখি, জমিয়ে রাখি। একসময় চল ছিলো ডায়েরির পাতায় ফুল শুকিয়ে রাখা, বন্ধুদের লেখা চিঠি, স্কুল-কলেজের র‍্যাগ ডে-তে বন্ধুদের লিখে দেয়া মন্তব্য, দু'কথা। বিভিন্ন সময়ে চলে যাওয়া ঘটনার নানান পদচিহ্ন। অথচ যা যায়, চলেই যায়। খুব সুখস্মৃতিগুলো মাঝে মাঝে প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়, যখন জীবনের নতুন ধাক্কা এসে ফেলে দিতে নেয়, তখন পেছনের ঐ রোমন্থন অনুভূতি জাগাবে যে আপনার জীবনে প্রাপ্তি বলে অনেক কিছুই ছিলো, সে কারো ভালোবাসা হোক, অন্য কোন অর্জন হোক। এছাড়া অন্য স্মৃতিগুলো বরং ঝরে যেতে দেয়াই ভালো। যা চলে যায় তাদের চলে যেতে না দিলে কি আর আগামী আসতে পারবে? স্মৃতিতে নতুনকে আলিঙ্গন করার জায়গা দিতে তাই অযথা স্মৃতিদের ঝরে যেতে দিতে হয়। পেছনে ফিরে তাকালে কেউ আগাতে পারে না, ব্যক্তি মানুষও নয়, জাতিটাও নয়। ইতিহাস কেবল একটা স্পৃহা। শিক্ষা ও উপলব্ধিটুকু ছাড়া তা নিয়ে পড়ে থাকলে তা এগিয়ে যাবার বাধা। এমন বাধাগুলোকে জীবনে বেঁধে না রাখলেই কি নয়?

২২ জানু, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৪৮

 

(৪৫৯)
আমরা হয়ত যা কিছুকে শেষ বলে মনে করি, তা হয়তো অন্য কিছুর শুরু। খুব বেশি আনন্দিত কিংবা খুব বেশি আশাহত হবার কিছু নেই! সব শেষেরই একটা শুরু থাকে, সব শুরুরই একটা শেষ থাকে। পৃথিবীটাই এমন...

(৪৬০)
কেউ কেমন করে বুঝবে একজন পোড় খাওয়া মুসাফিরের অভিজ্ঞতা সে নিজে হেঁটে পার হয়নি নিজ শহর বা গ্রামের ঐ মোড়গুলোই, জানে না মধ্য রাতে শ্বদন্তওয়ালা নষ্ট ছেলেগুলোর চোখের তীক্ষ্ণতা। অথচ সেই মুসাফির তো হেঁটেছে বছরের পর বছর, শহরে-গ্রামে-পাহাড়ে, তিক্ত-উষ্ণ-শীতল সব তীব্র পরিবেশে। কেমন করে ছোট্ট পৃথিবীতে মজে থাকা সংকীর্ণ মনের সামনের চোখ বুঝবে হাজার মাইল অতিক্রম করা হাজার মানুষ চোখে ধরে রাখা চোখদুটোর দৃষ্টিকে। পাহাড়ে উঠে মেঘকে সাদা মনে হলেই কি আর মেঘগুলো তুলোর মতন কিংবা সাদা রঙের হয়ে যায়? দৃষ্টির, উপলব্ধির আর অভিজ্ঞতাকে গুণতিতে না ফেললেই কি আর তা হিসেবের বাইরে চলে যায়? যা তুমি দেখতেই পাও না দুই চোখে, তা তুমি কেমন করে বুঝবে হে অবুঝ অহংময় অবিনয়ী উদ্ধত মানুষ?

(৪৬১)
তুমি তো অন্যের ততটুকু দেখেই একটা ধারণা করে বসো, যতটুকু দু'চোখে দেখতে পাও। আচ্ছা, কারো জীবনের কতটুকু তুমি জানতে বা বুঝতে পারো? তুমি কি জানো না, অদেখার একটা জগত আছে? সেখানে আছে জ্বিন, ফেরেশতা আর আল্লাহর আরো অজানা অজস্র সৃষ্টি। সেই জগতটা এই জগতের চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর, মোহনীয় --তা জানো? সে জগতটার অস্তিত্ব তো এই জগতের সমান্তরালেই।

তুমি কি তোমার ক্ষুদ্রতা অনুভব করতে পারো? তুমি ভাবতে পারো তোমার বিছানার কাঠের ঘুণপোকাটাও রিযিক পেয়ে বেচে আছে, আটলান্টিকের তলে একটা শেওলাও এই মূহুর্তে রিযিক পাচ্ছে তোমার আল্লাহর। তুমি কি বুঝতে পারছ এই সূর্যের যে আলো তোমার জানালার ফুটো হয়ে ফিনকি দিয়ে আলো ছড়াচ্ছে, ততটুকু আলোও কিন্তু তোমার জন্য বরাদ্দকৃত, সেটাও নিখুঁত করে তোমার আল্লাহর আদেশ।

তুমি কি ভেবে দেখেছ তুমি কতটা ক্ষুদ্র, আবার একই সাথে কতটা অসামান্য বিশেষ ভালোবাসা তোমার জন্য তোমার রবের পক্ষ থেকে? এই অদ্ভুত ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও মূল্যায়িত হবার অনুভূতি নিয়েও কি অন্তরে তুমি ঘৃণা, অহংকার, পরনিন্দা, হিংসার চাষ করতে পারো?

তুমি হৃদয়টা খুলে দিয়ে ওই আকাশের মতন করে দিতে পারো না? চেষ্টা করেই দেখো না, প্লিজ?

২১ জানু, ২০১৬

রুমী কবিতা (অষ্টাদশ কিস্তি)



* * * * *
শরীরকে কোনোদিন আত্মা থেকে আড়াল করতে কোন পর্দা দেয়া হয়নি, এমনকি কোন আত্মাকেও শরীর থেকে আড়াল করা হয়নি কখনো। তবু কখনো কোনো শরীর কোনদিন আত্মাকে দেখতে পায়নি। ~জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
যখন ঠোঁট দু'টো নিশ্চুপ হয়ে রয়, তখন হৃদয়ের থাকে সহস্র ঠোঁট। ~ জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
তুমি কি ভালোবাসার পথের তীর্থযাত্রী হতে চাও? প্রথম শর্ত হলো নিজেকে তোমার এতটাই বিনয়ী করতে হবে যেন তুমি স্রেফ ধুলো আর ছাই। ~ জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
প্রিয় হৃদয়! কখনো ভেবো না তুমি অন্যদের চেয়ে উত্তম। অপরের দুঃখগুলো সহানূভুতির সাথে শোনো। তুমি যদি শান্তি চাও, খারাপ চিন্তাগুলোকে মনের মাঝে রেখো না, পরনিন্দা কোরো না এবং এমন কিছু শেখাতে যেয়ো না যা তুমি জানো না। ~ জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
অর্ধেকটা জীবন হারিয়ে যায় অন্যদের খুশি করতে গিয়ে।
বাকি অর্ধেকটা হারায় অন্যদের কারণে তৈরি হওয়া দুশ্চিন্তা ও উৎকন্ঠায়।
এই খেলা ছাড়ো, যথেষ্ট খেলেছো তুমি।
~ জালালুদ্দিন রুমী

* * * * *
আমি তোমার প্রাণ জুড়াবো, আরোগ্য করবো ,
আমি তোমায় এনে দেবো গোলাপগুচ্ছ।
তবে আমিও যে ভরে আছি অজস্র কাঁটায়।
~ জালালুদ্দিন রুমী

২০ জানু, ২০১৬

মনের জানালা মাঝে # ৪৭

 


(৪৫৫)
যেদিন থেকে আপনি বর্তমানে বেঁচে থাকতে শিখবেন, সেদিন থেকে আপনি সুখে থাকতে পারবেন। অতীত-ভবিষ্যতের নিরর্থক বোঝা মাথায় নিয়ে কখনো সুখী হওয়া যায় না।

(৪৫৬)
মানুষ ভালোবাসা পেতে চাওয়ার কাঙ্গাল যতটুকু, সম্ভবত তার চেয়ে অনেক বেশিই কাঙ্গাল ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। হয়ত অনেক ক্ষেত্রে পেতে চাওয়ার কাঙ্গালপনাটাই বেশি প্রকাশ হয় বলে অমন ধারণাই বেশি প্রচলিত। অথচ মানুষ হরদম এই ভীড়ের মাঝে এমন মানুষদেরকেই খুঁজে বেড়ায়, যাদের ভালোবাসা যায়। সেটাই খুঁজে পায়না। হয়রান হয়ে থাকে হৃদয়গুলো। আসলে, যারা মানুষকে কম বিচার করে, বেশি দয়া করে, সহজে মিশতে পারে, অতিরিক্ত চিন্তা না করে অন্যের উপকার করতে পারে --তারা সহজে ভালোবাসতে পারে, তারা সহজে শান্তি পেতে পারে। সুখী হবার সূত্রটা আসলে খুবই সহজ, কিন্তু নির্বোধদের কাছে তা খুবই কঠিন।

(৪৫৭)
সব ধ্বংসই কি আর ধ্বংস বয়ে আনে? ধ্বংসের মাঝে অনেকেই খুঁজে পান নতুন সৃষ্টির প্রেরণা। সকল অন্ধকারই কি আশার শেষ? যারা জানেন আঁধার কেটে যায়, যারা জানে আঁধারের অর্থ, তারা নতুন সূর্যালোকের প্রত্যয় ধারণ করেন বুকে। শয়তান যখন আদমকে (আলাইহিস সালাম) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আসতে দেখেছিলো, ভেবেছিলো হয়ত সে তার অপকর্ম সেরে ফেলতে পেরেছে। কিন্তু শয়তান হয়ত বুঝেনি যে ডুবুরি সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তা আহরণ করে আনে। জীবনের কষ্টগুলোতে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়তে নেই। প্রতিটি কষ্টের মাঝে নতুন আনন্দের বার্তা আছে, প্রতিটি যন্ত্রণায় খুঁজে পাবেন স্বস্তির বাতাস। শুধু নিজের মতন করে জীবনকে চাইলে হবে? বরং যিনি জীবন দিয়েছেন, তার পরিকল্পনায় আস্থা রাখুন। তিনি যা পাঠাবেন, তার মাঝেই আছে ভালোবাসার চিহ্ন। জীবনে পাওয়া উপহারের ডালা খুলে দেখুন, খুঁজে পাবেন নতুন সম্ভাবনা, নতুন স্বপ্ন, নতুন অনুপ্রেরণার বার্তা।

(৪৫৮)
একজন দক্ষ মানুষ এবং নবিশ ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য কি জানেন? নবিশ যতবার একটা কাজের জন্য চেষ্টা করেছে, দক্ষ ব্যক্তিটি তার চেয়েও অনেক বেশিবার কাজটিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

১৯ জানু, ২০১৬

বিদায় ২০১৫ : পাওলো কোয়েলহো


বিদায় ২০১৫
সবাইকে জানতে হয় কখন কোনো একটা পর্যায় শেষ হয়। যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সময় তাকে থাকার জন্য যদি আমরা জোর খাটাই, আমরা শান্তি হারিয়ে ফেলবো। আরো হারাবো সেই পর্যায়টির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে যা শেখা যায় সে ব্যাপারগুলোকেও।

কোনো একটি পর্যায়ের শেষ, দরজা বন্ধ হওয়া, অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি — যে নামটিই আমরা দেই না কেন, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো জীবনের যে মূহুর্তগুলো শেষ হয়ে গেলো, তাদের ছেড়ে দেয়া।

আপনি কি চাকরিটা হারিয়েছেন? ভালোবাসার সম্পর্কটি শেষ হয়ে গেছে? বাবা-মায়ের বাড়িটি ছেড়ে আসতে হয়েছে? দেশ ছেড়ে প্রবাসে গিয়েছেন? দীর্ঘকাল ধরে চলা বন্ধুত্বের সম্পর্কটি হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে?

আপনি দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন কেন এমনটা হলো তা ভাবতে ভাবতে।

আপনি নিজেকে নিজে বলতেই পারেন– যে জিনিসটি আপনার জীবনে এতটা দৃঢ়ভাবে ছিলো, এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা হঠাৎ করে কেন এমন করে ধূলিস্মাত হয়ে গেলো তার কারণ উদঘাটন না করে আপনি আর একটি পদক্ষেপও দিবেন না সামনের দিকে।

কিন্তু এমন আচরণ আপনার সাথে জড়িয়ে থাকা সবগুলো মানুষকে তীব্র কষ্টের মাঝে রাখবে – আপনার বাবা-মা, আপনার স্বামী কিংবা স্ত্রী, আপনার ভাই-বোন, সন্তান, বন্ধুদের।

সবাই তাদের নিজ অধ্যায়গুলো শেষ করে চলেছে, নতুন পাতা উল্টেছে, জীবনে সবাই যখন এগিয়ে চলেছে তখন আপনাকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সবার খারাপ লাগবে।

সবকিছুই পেরিয়ে যায়। সবচেয়ে  ভালো যে কাজটি আপনি করতে পারেন তা হলো সত্যিকারভাবে পার হয়ে যেতে দিন।

সে কারণেই যে কাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ (যত কষ্টেরই হোক না কেন) তা হলো স্মৃতিগুলো ধ্বংস করে ফেলা। এগিয়ে চলুন, এতিমদের অনেক কিছু দান করুন, আপনার কাছে থাকা বইগুলো বিক্রি করুন নয়ত উপহার দিয়ে দিন।

আপনি যা কিছু দেখতে পান, তার সবকিছুই অদৃশ্য জগতের একটা স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি– তাই কিছু স্মৃতিদের হাত থেকে নিজেকে মুক্তি দেয়া মানে অন্যান্য স্মৃতিদের সেখানে কিছু জায়গা করে দেয়া।

যা কিছু যাবার যেতে দিন। মুক্তি দেন সেগুলোকে। নিজেকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে নিন। জীবনকে কেউ কখনো স্পষ্ট করে বুঝতে পারে না; তাই আমরা কখনো জয়ী হই এবং কখনো হেরে যাই।

কোন কিছুর বিনিময় চেয়ে কাজ করবেন না, আশা করবেন না আপনার কাজগুলো প্রশংসিত হবে। তেমনি আশা করবেন না আপনার প্রতিভার স্ফূরণ হবে, আপনার ভালোবাসা কেউ বুঝতে পারবে।

আপনার আবেগের টেলিভিশনে একই অনুষ্ঠান একটানা বারবার করে দেখা বন্ধ করুন যেখানে আপনি দেখতে পান কেমন করে আপনার একটা ক্ষত হয়েছিলো আর তাতে আপনি কতটাই না ভুগেছেন– এমন ব্যাপার তো আপনাকে শুধুই বিষাক্ত করে চলেছে, আর কিছুই নয়।

আপনার ভালোবাসার যে সম্পর্কটি ভেঙ্গে গেছে, তাকে গ্রহণ করতে না পারার মতন ভয়ংকর ব্যাপার তো আর নেই। তেমনই ভয়ংকর হলো এমন কাজ যার কোন শুরু হবার তারিখ নেই, এমন সিদ্ধান্ত যা সবসময় ‘উপযুক্ত মূহুর্তটির’ জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়।

একটা নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে আগেরটা শেষ হতে হয়। নিজেকে বলুন যে যা চলে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। নিজেকে সেই সময়টার কথা মনে করিয়ে দিন যখন আপনি সেই মানুষটি কিংবা সেই জিনিসগুলো ছাড়াই আপনি বেঁচে থাকতে পারতেন — কোনো কিছুই তো অপূরণীয় নয়। একটা অভ্যাস তো আর অভাব নয়। হয়ত কথাটি বেশি সরল শোনাচ্ছে, হয়ত ব্যাপারটি খুব বেশি কঠিন, কিন্তু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু চক্র বন্ধ হয়। তা কোন অহংকার, অযোগ্যতা, দম্ভের জন্য নয় বরং স্রেফ তা আপনাকে সাথে আর যায় না। দরজা বন্ধ করুন, স্মৃতিখাতাকে বদলে ফেলুন, ঘরদোর পরিষ্কার করুন, ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলুন।

আপনি যা ছিলেন তা থেকে বদলে আপনি প্রকৃতপক্ষে যা , সেটিই হয়ে যান।

—– পাওলো কোয়েলহো

২৪ ডিসে, ২০১৫

এবার তবে নিশ্চুপ থাকা হোক

 

প্রতিটি মানুষের জীবনই কষ্টের। এমনকি যে অপরাধ করতে করতে নিজেকে জুলুম করছে, সে-ও তার অপরাধবোধ, গ্লানি ঢাকতে অন্য কিছু করে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। অথচ রোগে যখন সে ভুগতে থাকে, অথবা যখন মরে যায়, তাকে কাফনের কাপড়ে পেঁচিয়ে মাটির নিচে রেখে আসা হয়। যুগে যুগে শত-শত ক্ষমতালোভী শাসকগুলো এভাবেই বিদায় নিয়েছে। এরপর, একসময় তারা হয়েছে ইতিহাসে বিলীন। কেউ জানেনা, খোঁজ রাখেনা।

ভাবলে কেমন অদ্ভুত লাগে, না? যে মানুষটি হয়ত পৃথিবীর কোনো একটি কোণে, এই যেমন ইয়েমেনে কিংবা সিরিয়ায় আজ একটা পথচারী কিশোর হেঁটে চলতে গিয়ে বোমার আঘাতে মরেই গেলো। কেন মরলো, কে মারলো-- বুঝলোই না। আবার হয়ত হেবরনে, পশ্চিম তীরে অথবা কাশ্মীরে দখলদারী আর্মির হাতে একটা কিশোর হয়ত বন্দী হলো যখন, তখন তার বয়েসি পশ্চিমা ছেলেগুলো পার্টি করে, নাইটক্লাবিং করে কোমর দোলাচ্ছে। বন্দী ছেলেটি অপরাধ সে বুঝলোও না, তাকে গরম পানিতে পুড়িয়ে, বেয়নেটে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হলো। লাশটাও ফেরত গেলো না। কিশোরের মা আহাজারি করে বাকিটা জীবন পার করবে। অথবা হয়ত সেই অভাগী মা একদিন নিজেই গুলি খেয়ে মরে যাবেন।

জীবন-মৃত্যুর এই খেলা যখন চলছে, তখনই কেউ আবেগঘন প্রেম করছে, কেউ ঝগড়া করছে, কেউ ঠকাচ্ছে, কেউ বার্থডে কেক কাটছে। সবকিছুরই সাক্ষী থাকছে অনেকগুলো রূহ, অনেকজন ইনসানের। তখনই আকাশে হয়ত আলোচ্ছটা জ্বললো উল্কাপিন্ডের। ফুল ফুটছে বাগানে, একজন গার্ডেনার বছর ধরে বসে ছিলেন নাইটকুইনকে ফুটতে দেখবেন বলে। একদল ডলফিন ঝুপ করে লাফ দিলো। পৃথিবীময় সৌন্দর্যের এই নিপুণ বাগানে কত ঘটনা! কত সৃষ্টি, কত প্রেম, কত ভালোবাসা চারপাশে। তবুও নিষ্ঠুর মানুষগুলোই হত্যা করে, কী পেতে চায় কে জানে? হিংসায় জ্বলে-পুড়ে নিজেই ডুবে যায় অনল দহনে।

এত অনুভূতি ধারণ করতে পারে কি কোনো অন্তর? আমাদের হৃদয়ের মাঝেই তো আকাশের মতন বিশালতা আছে, তবু কি পারি এই পৃথিবীর বৈচিত্র্যকে অনুভূতিতে ধারণ করতে? তীব্রতম কষ্টের মূহুর্তগুলো কোনো সাহিত্যে থাকে না, কেউ লিখতে পারে না। তেমনি সর্বোচ্চ আনন্দের মূহুর্তও পাওয়া যায় না কোথাও। মানুষ পারেনা সুন্দর কিংবা কষ্টকে শব্দে ধারণ করতে।

বাকি সবই খুব অগভীর, প্রদর্শনী কেবল। অগভীর অনুভূতিহীনতায় সবাই ভেসে যায়। অবাক পৃথিবীতে অনেকেই লিখতে চেয়েছে, একসময় হয়ত শ্রান্ত হয়ে নিশ্চুপ হয়ে যেতে চেয়েছে। পারবে না বলে ছেড়ে দিতে চেয়েছে কেউ কেউ।

যিনি বানিয়েছেন সব, সমস্ত সুন্দর-অসুন্দর,ভালো-মন্দগুলো নিয়ে তিনিই বলা উত্তম। থাকুক তবে সকল শব্দ। এবার তবে নিশ্চুপ থাকা হোক।

**************
৩০ নভেম্বর, ২০১৫
সন্ধ্যা ৬-১৫ মিনিট

১৬ ডিসে, ২০১৫

মনের জানালা মাঝে # ৪৬



(৪৫০)
খুব সুন্দর একটা ভবিষ্যত গড়ে নিতে সুন্দর অতীত থাকা বাধ্যতামূলক নয়। নিজেকে সুযোগ দিন। আপনার হাতে সময় আছে, বর্তমানকে কাজে লাগান। পেছনের দিকে না তাকিয়ে নিজের সেরাটুকু ব্যবহার করুন বর্তমানের মাঝে...

(৪৫১)
সকল ক্ষতিই মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারে। মানুষ পরম অভিযোজন ক্ষমতার একটি প্রাণী। যাকে ছাড়া/যা ছাড়া জীবন কল্পনাও করতে পারেননি, তার বিদায়ের পরে আপনি দিব্যি খাবেন, ঘুমাবেন, হাসবেন। কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। দুঃখ নয়, গ্লানি হয়। এমনকি আনন্দের সময়ও নয়। দুনিয়া নিজেই অস্থায়ী। এর ভেতরের প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি সত্ত্বা, প্রতিটি কণা অস্থায়ী, নশ্বর। এমন কিছুর প্রতি কীসের এত আকাঙ্ক্ষা, এত স্বপ্ন আর কল্পনা-জল্পনা আমাদের যা কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে শেষ হয়ে যাবে?

(৪৫২)
আপনি হয়ত অনেক ভালো কাজ করতে চান। গাছে পানি দেয়াও তেমন। সেই চিন্তা থেকে একটা গাছে পানি দিলেন নিয়মিত। পরে দেখলেন গাছটা ক্যাকটাস, সেটার পানির দরকারই নেই ওভাবে। তাতে কি আপনার ক্ষতি হলো? নাহ! এটাও শিক্ষা হলো, জীবনের এক নিগূঢ় জ্ঞানার্জন হোলো। এমন হাজারো অনাকাংখিত শিক্ষার সমন্বয়ই আমাদের জীবন।

 (৪৫৩)
সব সমস্যার বেশি সরলীকরণ করলে সমস্যা। জটিল সমস্যার সরল সমাধান চাইতে গেলে সব হারাতে হয়। একই বুঝ দিয়ে সবাইকে বুঝতে গেলেও বিপদ।

(৪৫৪)
সবকিছুর সময় আছে। সবকিছুর একটা তীব্র সময় থাকে। চাঁদ যেমন পূর্ণিমায় তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। অন্য সময়ে চাঁদের আলো ক্ষীণ থাকে, অমাবশ্যায় সে নিভেই যায়। মানুষের জীবনের অনেক কিছুই হয়ত তার সাথে মিলে যায়।

হয়ত অনেকের লেখালেখিও অমনই। হয়ত অনেক ফেবু পাতাও অমন। অনেককাল নিয়মিত শব্দগুচ্ছ ভেসে এসেছে অনেকের চোখে। দীর্ঘদিন সকালে-দুপুরে-রাতে প্রযুক্তির নানান ছোঁয়ায় খুব সাধারণ কথাগুলোও কিছু নামহীন পরিশ্রমের ফল হয়ে প্রকাশ হয়েছে নিয়মিত বিরতিতেই। হয়ত সে বিরতি দীর্ঘায়িত হবে, হয়ত অমাবশ্যার আঁধারের মতন মিলিয়ে যাবে। কে জানে তা?

সবকিছু কেবল তিনিই জানেন, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তবে, গাছের পাতাও যেমন বসন্তে সুশোভিত হয়, ধীরে ধীরে শীতে এসে ঝরে পড়ে শুকিয়ে। জীবনেও আমাদের অমন কতই না চক্র রয়েছে। হতে পারে, কিছু ফেবু পাতাও অমন চক্রের অংশ। প্রযুক্তির সৃষ্টি এই পরাবাস্তব জগতের প্রদর্শনীটুকুর পেছনে তো মানবিক ও প্রাণিজ মানুষেরই সক্রিয় উপস্থিতি। তাকেও তো মানতে হয় বসন্ত-গ্রীষ্ম-শীতের নিয়ম।

প্রকৃতিপানে চেয়ে, তাতে অনুভব করে শেখার আছে অনেক কিছু। নিতান্ত সহজ সরল চেহারায় জীবনের গভীরতম জীবনোপলব্ধি ওতেই পাওয়া যায়। আল্লাহ আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন, আমাদের সকল ভালো কাজকে কবুল করুন।

১৫ ডিসে, ২০১৫

অনেকক্ষেত্রে তথাকথিত মুক্তমনা এবং ধর্মপ্রচারকরা একই রকম


অনেকক্ষেত্রে তথাকথিত মুক্তমনা এবং ধর্মপ্রচারকরা একই রকম -- শুনতে একটু কেমন কেমন লাগতে পারে। তবে ঘটনা সত্য। এটা একটা খুব সাধারণ মানসিকতা। অনেক ধর্মপ্রচারক আছেন, যারা নিজেদের চিন্তাটাকেই একমাত্র সঠিক মনে করেন, তারা ভিন্ন কোন ধারণাকে সহ্যই করতে পারেন না এবং শত্রু হিসেবে গণ্য করেন। অথচ তাদের 'মতামত' ভুল হতেও পারে, সেটা ঐশীবাণী নয়। তবে, সেই মতামতকেও তারা সঠিকতম হিসেবে ধরে অন্যদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন।

শুধু ধর্মপ্রচারক নয়, প্রচুর তথাকথিত মুক্তমনার দল এই ধরণের মানসিকতাকে ধারণ করে। সোজা বাংলায় এই মানসিকতাটাকে বলা যেতে পারে বাইনারি চিন্তাভাবনা। তারা মুক্তমনা হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করলেও ভিন্নমতের প্রতি তারা আগ্রাসী মনোভাব ধারণ করেন। যুক্তি সেখানে মূল্যহীন হয়ে যায়।

এখানে খুব সুন্দর গোলকধাঁধাঁ হলো -- এই মুক্তমনা দাবী করা ক্ষুদ্রমনারা প্রকৃতপক্ষে বাধ্য করেন অন্যদের যেন তাদেরকে গ্রহণ করা হয়। যেন মুক্তমনা হবার একটি মাত্র পথ রয়েছে !! তারা মূলত ভিন্নমত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। আরেকটি বিষয় হলো, তারা মূলত নিজেদেরকে নিয়েই সন্দিগ্ধ থাকে।

বেশিরভাগ মানুষের মাঝে এই মানসিকতা আছে। এই মনগুলা খুবই বাইনারি, তারা কেবল নিজেদেরকেই সঠিক এবং অন্যদেরকে ভুল মনে করেন। এদের বেশ কিছু গুণাবলীর একটা হলো, তারা প্রচন্ড আবেগপ্রবণ হন এবং আবেগাক্রান্ত অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই আবেগতাড়িত মনগুলো অন্য মানসিকতার ও অন্য মতের লোকদেরকে ভয় পায়। নিজেদের অবস্থানকে হারিয়ে ফেলার ভয়ও রয়েছে এতে। ফলে সেই ভয় তাদের পেয়ে বসে বলেই ভিন্ন মতকে প্রচন্ড শক্তিতে আক্রমণ করে ধরাশায়ী করে ফেলার চেষ্টা করে।

এই মানসিকতার ধারক মনে হয় এই সমাজে তো বটেই, এই পৃথিবীতেও প্রচুর দেখা যাচ্ছে। এই মানসিকতার মানুষগুলো দিনদিন এমন ধারণার দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে চলেছে যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক কোন যাচাই করা হয়না এবং অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি বা যুক্তিহীন হয়ে থাকে।

চিন্তার উৎকর্ষ সাধন প্রয়োজন। নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে কেন আমি এই কথা বলছি, চিন্তা করে দেখতে হবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সত্য একটা হলেও সত্যের কাছে পৌঁছানোর অনেকগুলো পথ থাকতে পারে। অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি এই সময়ের দাবী, এই পৃথিবীর দাবী।

লেখাটির অনুপ্রেরণাঃ
- বিষয়ঃ ডগম্যাটিক মাইন্ড/Dogmatic Mind
- বইয়ের নামঃ The Quest For Meaning : Developing the Philosophy of Pluralism, লেখক: তারিক রমাদান, প্রফেসর, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি
- প্রাসঙ্গিক ভিডিও: http://www.youtube.com/watch?v=XgW3vP7p3no

১৪ ডিসে, ২০১৫

ভাঙ্গবেন তবু মচকাবেন না? এই ভয়াবহ ভুল থেকে বেরিয়ে আসুন!



সমাজে আমাদের অজান্তেই অনেক কিছু শেখানো হয়। তার মধ্যে একটি হলো, 'ভাঙ্গব তবু মচকাবো না' নাকি শক্তপোক্ত মানুষ হবার যোগ্যতা। অথচ, এটা স্পষ্ট অহং তথা 'ইগো'ওয়ালা কথা। কী অদ্ভুত খারাপ একটা বিষয় চালু হয়ে আছে আমাদের অনেক মানুষের মাঝে!

মুসলিমদের আল্লাহ নিয়মিত বিপদ দেন, পরীক্ষা করেন। তারা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে। কাফিরদের রশি আল্লাহ ছেড়ে দিয়ে রাখেন, তারা সহজে বিপদে বাঁকা হয় না। মুমিনদের তুলনা হলো ঘাস কিংবা লতাগুল্মের মতন। প্রতিটি দমকা হাওয়া তাদের উপরে দিয়ে বয়ে যায়, তাদের নাড়িয়ে দেয়। কাফিরদের তুলনা হলো বিশাল বৃক্ষের মতন। হাওয়া তাদের উপরে প্রভাবই ফেলে না। কিন্তু বড় একটা ঝড় এলে তারা শেকড় সহ উপড়ে যায়, সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।

মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত 'vulnerable' (ভালনারেবল) হওয়া। ওই কথার সাথে মিলিয়ে বলতে গেলে তা হবে 'প্রচুর মচকে যাওয়া'। আমাদের মাঝে অজস্র মানুষ আছে, অন্যের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশের ভয়ে 'rigidity' (শক্তিশালী হিসেবে) দেখায়, কৃত্রিমভাবে নিজেকে শক্তপোক্ত করে প্রকাশ করে। তারা নিজেকে সারাক্ষণ চাপের মধ্যে রাখে, সত্যিকারের সত্ত্বাটাকে অন্যের কাছে প্রকাশ করে না।

কিন্তু, আপনি যখন ঠিক আপনার মতন হয়ে অন্যের সাথে মিশবেন, ঠিক সত্যিকারের আপনি যখন অন্যের সাথে আলাপচারিতা করবেন তখন আপাতদৃষ্টিতে অনেকে দুর্বল মনে করতেও পারে। ফলশ্রুতিতে আপনাকে আহত করতেও পারে। কিন্তু আপনি এই 'মচকে' যাওয়াতেও কিছুতেই পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বেন না। ব্যথা সারিয়ে, ভুলটুকু বুঝে সংশোধিত হয়ে, নিজেকে আবার খুব সহজেই এই ধাক্কা থেকে কাটিয়ে উঠতে পারবেন। আপনি আবার হৃদয় উন্মুক্ত করে অন্যদেরকে আপনার কাছে টেনে আনতে পারবেন। আবার, আপনি এবার আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হলেন, আপনি অনেক ব্যথাকেই এখন দূর থেকেই চিনতে পারেন, কাটিয়েও উঠতে পারেন। খারাপ মানুষদের কারণে আপনি আপনার হৃদয়ের কোমলতা, সজীবতাকেও হারাবেন না। কেননা, অনেক মানুষই খারাপ লোকের দ্বারা আহত হয়ে বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। এই ভুল সিদ্ধান্তে সে নিজেও ধ্বংস হয়, আরো অনেককে ধ্বংস করে।


আপনি যখন হৃদয় উন্মুক্ত করে ভালোবাসতে পারবেন, তখন আপনি অনেক শক্তিশালী মানুষ। মানুষের প্রতি সন্দেহ-সংশয়-বিতৃষ্ণা নিয়ে তাদের কাছে গেলে তারা সহজেই বুঝতে পারে আপনি একজন 'দূরের মানুষ'। আপনি তখন সত্যিকারের দুর্বল। কেবলমাত্র সাহসীরাই অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে, কেবলমাত্র সাহসীরাই ভালোবাসতে পারে। কেবলমাত্র সৎ অন্তঃকরণ যাদের, তারাই অকপট হতে পারে, সরল, ভঙ্গুর হতে পারে, তারাই জেনুইন (genuine), ভালনারেবল (vulnerable) হতে পারে।

পৃথিবীতে আপনি ক্রমাগত আঘাতপ্রাপ্ত হবেন। হতেই হবে। এটাই জগতের রীতি। তবে এই আঘাতে নিয়মিত মচকাতে থাকুন, কাঁদুন, আহত হোন। আবার জেগে উঠুন।

হৃদয় আপনারই, আপনার মৃত্যুর আগে কেউ একে কেড়ে নিতে পারবেন না। একে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আপনি যা, তেমনটিই হোন। আপনি যেমন, তেমন স্পষ্ট, সরল ও সত্যিকার আপনাকে উপস্থাপন করুন অন্যদের কাছে।

'ভাঙ্গবো তবু মচকাবো না' বলে অহং নিয়ে চলে কী লাভ? শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয় অহংভরা মিথ্যুক, শয়তান। ভালনারেবল (vulnerable) হোন, সরল হোন, আপনি যেমন তেমনটিই হোন। 'প্রকৃত' আপনাকে আঁকড়ে ধরে সংশয় থেকে বেরিয়ে আসুন। সাহসী হয়ে ভালোবাসুন। হয়ত ধাক্কা খাবেন, আহত হবেন; কিন্তু তবু কখনো ধ্বংস হবেন না ইনশা আল্লাহ। আরো বেশি শক্তিশালী হতেই থাকবেন, আরো বেশি 'মানুষ' হতে থাকবেন। মানুষের মতন মানুষ....

[০২ ডিসেম্বর, ২০১৫]

১৩ ডিসে, ২০১৫

মনের জানালা মাঝে # ৪৫

 


(৪৪৭)
শেষ কবে আপনি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখেছেন? আমরা যাদের জ্বলতে দেখি টিমটিম আলোয়, সেই মূহুর্তের সেই আলোটাও তো কত শত বছর আগে ওখান থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছিলো তা হিসেব করার বিষয়, কিন্তু অমন নক্ষত্র, গ্রহ তো ওই আকাশে, এই মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে লাখে লাখে। ওদের একেকটার আকার আমাদের এই পৃথিবীর চেয়েও অনেক বড়। ওদের ওখান থেকেও আমরা একটা বিন্দুর মতই। এই বিন্দুতেই আমাদের সব। এই বিন্দুটুকুর আরো বিন্দু অংশ নিয়ে হাজার হাজার সৈনিক যুদ্ধ করেছে, সেনাপতিরা নিজেদের অমিত শক্তিশালী মনে করেছে হয়ত কোন একটা অংশ বিজয় করে। শাসকেরা নিজেদের ভাষ্কর্য উদ্বোধন করে, অফিসে অফিসে নিজের ছবি ঝোলায়; মনে করে তাদের এই শক্তি আর এই সময় হয়ত রয়ে যাবে। মহাবিশ্বের এইটুকু বিন্দুতেই শত-সহস্র ধর্ম রয়েছে যারা সবাই নিজেকে সঠিক মনে করে। এটুকুতেই রয়েছে অনিন্দ্য সুরের ঝংকার তৈরি করা লক্ষ লক্ষ সংগীতজ্ঞ, গভীর জীবনবোধ নিয়ে কবিতা ও গল্প লেখা হাজার-লক্ষ কবি আর ঔপন্যাসিক এসে চলেও গেছে। এটুকুর মাঝেই কত আঁকিয়ে যে এঁকেছেন ছবি, শিল্পে আর সংস্কৃতির চর্চার গভীরমূলে গিয়েছেন কত শত জন! এটুকুতেই রয়েছে কত প্রেমিক, কত প্রেমিকা। কত ভালোবাসা, কত টান আর কত আবেগ! কত অশ্রু আর কত হাসি। এখানেই রয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ, কেউ কিছু পেলে অপরের জ্বালা ধরা মন্তব্য নির্নিমেষ। এটুকু জায়গায় কত মানুষের কত মত, কত ক্রোধ, কত অহং, কত ঘৃণা। অথচ এই সুবিশাল আয়োজন, এই অন্ধ ক্রোধান্ধ, আমিত্বকে জয় করার নিরুদ্দেশ যাত্রাপথে কারো কি তার ক্ষুদ্রতা নিয়ে আদৌ অনুভব হয়? এই টুকুন সৃষ্টির মাঝে, এই বিন্দুর মাঝে এত সিন্ধু যিনি স্থাপন করেছেন, তার বিশাল সৃস্টির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে হয়ত আনমনেই অনুভব হবার কথা ছিলো, "হে আমাদের স্রষ্টা, আমাদের মালিক! আমাদের দয়া করুন। আমাদের চিন্তার আর হৃদয়ের সীমাবদ্ধতা ও ক্ষুদ্রতাকে সহ্য করতে না পারার এই জ্বালা থেকে মুক্তি দিন আপনার দয়া আর মহত্বের স্পর্শে।"

(৪৪৮)
জীবনটার দৈর্ঘ্য খুবই কম। কেবল একটু পেছনে তাকিয়ে দেখবেন, মনে হবে যেন ৫ বছর আগের ঘটনাটা মাত্র অল্প ক'দিন আগের! আমাদের চারপাশে অনেক খারাপ মানুষ, প্রায়ই অনেক খারাপ ঘটনা ঘটে। আমরা যদি সেসবে আটকে যাই, শংকা-চিন্তা-হতাশা-দুঃখে পড়ে আমরা তখন আমাদের সত্যিকারের লক্ষ্যে পৌঁছতে আমরা বাধাগ্রস্ত হবো। ভালো চিন্তা, হৃদয়জোড়া ভালোবাসা, উচ্ছ্বাসভরা বুকে মানুষকে হাসিমুখ করে দেয়ার মতন কাজের বিকল্প নেই।

জীবনটা খুব ছোট। যে কোন ধরণের ক্ষুদ্র/খারাপ/মন্দ চিন্তা এবং দুশ্চিন্তা/শংকার মাঝে ডুবে থাকার মাঝে কোন ন্যুনতম কল্যাণ নেই। এগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে, কষ্টের মাত্রা, খারাপ লাগার মাত্রা যেমনই হোক না কেন। কাজের মাঝে বেঁচে থাকতে হবে-- কল্যাণকর কাজ, ভালো কাজ, আনন্দময় কাজ।

(৪৪৯)
ভালো ছাত্রত্বই কখনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক স্কুল জীবনের 'ফার্স্ট বয়/ফার্স্ট গার্ল' নানান কারণে 'ভালো কোথাও' ভর্তি হতে পারে না। ভালো রেজাল্টও ভালো চাকুরির নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক অনার্স সিজিপিএ পাওয়া ছেলেমেয়ের চেয়ে সময়মত পাশ করে বের হতে না পারা ছেলেরা অনেক অর্থ উপার্জন করেছে/করছে এমন উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি। সৎ থাকলেও যে আপনার গায়ে অসততার কালিমা আসবে না তা বলা যায় না, অনেক সৎ মানুষকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়ে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে এমন গল্পও আমাদের অনেকের আত্মীয়দের জীবনেই আছে। চরিত্র সুন্দর হলেও যে অপবাদ আসবে না, সেটাও বলা যায় না। অপবাদ দেয়ার কাজ যারা করতে ভালোবাসে তারা তো আল্লাহর প্রিয়তম বান্দাদেরকেও ছাড়েনি।

পরিশ্রম করলেই উত্তম ফল হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে পরিশ্রম না করলে উত্তম ফল অসম্ভব। আর হ্যাঁ, সবার পরিশ্রম একই রকম হয় না। একেকটা মানুষের জীবনের ঝড় একেকটা সময়ে আসে তীব্র হয়ে। সবার জীবন আলাদা, জীবনে পাওয়া রহমত আলাদা, জীবনের পদ্ধতি আর গড়ে ওঠা আলাদা, শক্তি আর দুর্বলতাও আলাদা। আল্লাহই সুনিপুণভাবে সবকিছু জানেন। কেবলমাত্র তার হাতেই সমস্ত ক্ষমতা। সমস্ত কিছু দেয়ার মালিকও তিনিই। তাই, কাজ করতে হবে সর্বাত্মক চেষ্টার সাথে, কিন্তু মনে রাখতে হবে ফলাফল একান্তই আল্লাহর দান। সমস্ত প্রার্থনা আর অন্তরের নিগূঢ় কথপোকথন কেবলই আল্লাহর সাথে হতে হবে।

১২ ডিসে, ২০১৫

কীভাবে সুখ পাওয়া যায় জীবনে?



প্রতিটি মানুষ সুখী হতে চায়। প্রতিটি মানুষের চাওয়ার ভেতরেই থাকে সুখী হবার অদম্য আগ্রহ। শব্দগুলো কাছাকাছি, অল্প কিছু পার্থক্য যদিও আছে বাংলায় -- সুখ, শান্তি, প্রশান্তি। কখনো ভালোলাগাও এমন শব্দ। কীভাবে তা অর্জন করা যায়?

দার্শনিক ব্লেইজ প্যাসকেলের একটি থিওরিতে পড়লাম -- মানুষের মূলতঃ তিনটি সত্ত্বার মাঝে অভাবের অনুভূতি থাকে -

১) শারীরিক
২) বুদ্ধিবৃত্তিক
৩) আত্মিক

জন্মের পর থেকেই মানুষ পরনির্ভরশীল। প্রথমেই তার মা-কে প্রয়োজন হয়। মায়ের একটানা যত্নে সে বড় হয়। শারীরিক এই মা-নির্ভরতা থেকে যখন সে খানিকটা বড় হয়ে স্বনির্ভর হতে শেখে, তখন থেকে তার মনে অনেক প্রশ্ন থাকে। এই প্রশ্ন হলো-- বুদ্ধিবৃত্তিক অভাব। সে নিজে থেকেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে কেন সে এইখানে এলো।

মৃত্যুচিন্তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রায় প্রতিটি মনেই মৃত্যুর কথা এলেও সে এই চিন্তাকে ভুলে থাকতে চায়, এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু তার খেয়াল থাকে না এই সত্যকে তার আলিঙ্গন করতেই হবে।

মানুষ বেশিরভাগ সময় অসুখী হয় অন্যের দিকে তাকিয়ে। তুলনা করতে গিয়ে তার মনের সুখ তিরোহিত হয়। অথচ প্রতিটা জীবন একদম আলাদা। আরেকজনের সাথে কারো কোন মিল থাকে না। সুখ প্রত্যেকের নিজের দিকেই তাকিয়ে অনুভব করা উচিত। কখনো কখনো একটা মূহুর্তের ক্ষুদ্র ভালোলাগাই জীবনে আনন্দের ঢেউ বয়ে আনে। বুদ্ধিমান মানুষ, যারা নিজেদের বুদ্ধিকে ব্যবহার করে, তারা অন্যদের সুখ দেখে নিজেকে সুখী-দুখী হিসেব করতে বসে না। তারা নিজেদের জীবনকে নিজেদের চোখেই দেখে।

যারা আবেগের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তারা সুখ পায় না। যারা আবেগকে চিনে নিয়ে তাকে জয় করে, তারা আবেগ থেকে উদ্ভুত আনন্দও পায়, বিপদেও পড়ে না। আবেগ এক ধরণের ফাঁদ, সেই ফাঁদে আবেগস্বর্বস্বরা নিয়মিত ভূপাতিত হয়।

রেফারেন্স:
- প্রাসঙ্গিক ভিডিও : The Quest for Meaning - ড তারিক রমাদান - http://www.youtube.com/watch?v=XgW3vP7p3no

১১ ডিসে, ২০১৫

আপনার হৃদয় কি ভারাক্রান্ত?


আপনার হৃদয় কি ভারাক্রান্ত? কষ্টে-যন্ত্রণায়, অপ্রাপ্তি-অশান্তি, শঙ্কায়-অস্থিরতায় কাটাচ্ছেন? একটা ব্যাপার জানেন? পৃথিবীতে এই মূহুর্তে কোটি কোটি মানুষ আপনার চেয়েও ভয়ংকর কষ্টে সময় কাটাচ্ছে। আপনি কি ভেবে দেখেছেন, আপনার এই মূহুর্তটা কিন্তু বেশিদিন থাকবে না!

কষ্টের একটা সময় থাকে। প্রথম ধাক্কাটা কিছুটা তীব্র হয়। কিছু বিষয়ে আবার পরবর্তীতে কষ্টটায় দীর্ঘ সময় ধরে ভুগতে হয়। সেগুলো যেমনই হোক, মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। সন্তানকে কবরে রেখে এসে পিতাকে বের হতে হয় জীবিকার সন্ধানে। সন্তান আর স্বামী মরে যাওয়ার পরেও একজন নারী ফিরে এসে রান্নার যোগাড় করেন অন্তত খেয়ে বেঁচে থাকতে। জীবন এমনই। আপনি যে কষ্টটিকে সহ্যের অতিরিক্ত ভাবছেন, যে ক্ষতিটাকে কল্পনাতীত ভেবে আপনার বুক ফেটে যাচ্ছে -- সেটুকুকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রেরণা পেতেন আরো অসংখ্য লোক। তারা সেটুকুও পান না।

আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার ইবাদাতের জন্য। আপনি না চাইলেও আপনাকে তিনি উপলব্ধি করিয়েই দেবেন যে আপনি এই পৃথিবীর কোনো কিছুরই উপরে ক্ষমতা রাখেন না, আপনি অসহায়। এই উপলব্ধিটা একটি পরম নিয়ামাত যখন আপনি বুঝবেন আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই অভিভাবক।

সকল ক্ষতিই মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারে। মানুষ পরম অভিযোজন ক্ষমতার একটি প্রাণী। যাকে ছাড়া/যা ছাড়া জীবন কল্পনাও করতে পারেননি, তার বিদায়ের পরে আপনি দিব্যি খাবেন, ঘুমাবেন, হাসবেন। কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। দুঃখ নয়, গ্লানি হয়। এমনকি আনন্দের সময়ও নয়। দুনিয়া নিজেই অস্থায়ী। এর ভেতরের প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি সত্ত্বা, প্রতিটি কণা অস্থায়ী, নশ্বর। এমন কিছুর প্রতি কীসের এত আকাঙ্ক্ষা, এত স্বপ্ন আর কল্পনা-জল্পনা আমাদের যা কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে শেষ হয়ে যাবে?

[০৩ ডিসেম্বর, ২০১৫]

১০ ডিসে, ২০১৫

মুসলিমরা কেন বিশ্বজুড়ে ভুক্তভোগী আর অত্যাচারিত?

বিগত বেশ কয়েক শতাব্দী থেকেই মুসলিমদের মাঝে জ্ঞানের অভাবে, শ্রেষ্ঠত্বের অভাবে, নিজেদের কন্ঠকে প্রকাশ করতে না পারায় (যার পেছনে বেশিরভাগ ভূখন্ডের কলোনিয়ালিজম দায়ী, বা সংখ্যালঘুত্ব দায়ী) তাদের মাঝে 'ভিকটিম মেন্টালিটি প্রকট হয়ে থাকে। তাই তাদেরকে কনস্পিরেসি থিওরি গেলানো যত সহজ, আর কোন ধর্ম-জাতি-আদর্শের লোকদের এতটা সহজ না। তাই কোন ছবি দেখিয়ে যদি বলা হয়, 'অত্যাচার' করা হচ্ছে -- যাচাই বাছাই ছাড়াই তখন ধরে নেয়, এটাই তো আমাদের হয়, সুতরাং 'প্রচার করার মাঝেই আমার কাজ শেষ'। ফলে এইসব প্রচার করে, গলাকাটা, বোমফাটা ছবির শেয়ারিং যত হয়, দিনশেষে ওই মানুষটার ভিতরের প্রত্যয়ও সাধারণত জাগেনা নতুন কিছু করার।

নিজেদেরকে ভুক্তভোগী মনে করার এই মানসিকতা আসলে দুর্বল চিত্তের, অযোগ্য-অপদার্থ মানসিকতার প্রকাশ। শেয়ারিং করলে যাচাই বাছাই করতে হবে সেটা কতটা সত্য। আর মাথায় রাখতে হবে, দুনিয়ার বুকে যোগ্যতা সবসময়েই সর্বাধিক গুরত্বপূর্ণ বিষয়ের একটা। নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে হলে যোগ্যতা নিয়েই বড় হতে হবে। আপনি ক্লাসে ফার্স্ট হোন, একদিন টিচার হবেন --সম্মানিত গুরুত্বপূর্ণ পদ। আপনি অফিসের সবচাইতে আন্তরিক আর কর্মঠ কলিগ হোন -- আপনার বিশ্বস্ততা আর অসাধারণত্ব নিয়ে শত্রুভাবাপন্নরাও তেমন কিছু করতে পারবেনা।আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তেমনি, আল্লাহর দ্বীনকে যারা বুকে নিয়ে জীবন চালাচ্ছে, তারা যদি হয় উত্তম চরিত্রের, নিজের আশেপাশের ভাইয়ের প্রতি অনুভূতিতে নিপুণ, দক্ষ বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, মুভি মেকার, অথবা একজন সাধারণ মানুষ যিনি নিপুণ চরিত্রের, ব্যক্তিত্বের তাহলে এমনিতেই মুসলিমদের উন্নতি হবে।

তবে অনুগ্রহ করে নিজেকে নিজেই চেক করা দরকার, আমরা কি ভুক্তভোগী থাকার মানসিকতা (victim mentality) নিয়ে গড়ে উঠছি? নাকি নিজেদের থেকেই কিছু করার ব্যাপারে প্রত্যয়ী হয়েছি? আজ থেকে ৫০ বছর আগেও এমন ছিলো না। আমেরিকার সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব অল্প ক'টাতেই ইহুদি শিক্ষক ছিলো। এখন প্রায় প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিগুলোতেই ইহুদি শিক্ষক আছে, যারা নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের সর্বাত্মক উন্নতি করছে। বুদ্ধি আর মেধাকে বিকশিত করতে না পারলে মুসলিমদের পরাজিত হয়েই বোধহয় থাকতে হবে।

তবে আশার আলো আছে, এখন অনেকেই নিজেদেরকে উন্নত করছে সারাবিশ্বে। সারাবিশ্বে দেশে দেশে মিডিয়াতে বামপন্থী/ইসলামবিদ্বেষীদের আধিক্য সংবাদকে একপাক্ষিক করে ফেলে এখন। মিডিয়াও মানুষের মনোজগতে বিশেষ ক্ষমতা দখল করে ফেলেছে। তবে মুসলিমরা তাদের কাজগুলো করলে এই বিষয়গুলোতে বস্তুনিষ্ঠতা আসতে পারত কারণ তারা যেকোন অবস্থাতেই সত্য আর সুন্দরের পক্ষে থাকবে। বিশ্বমানুষের মুক্তির জন্য মুসলিমদের নিজেদের মনোজগতকে উন্নত করা প্রয়োজন। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ও যোগ্যতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।


রেফারেন্স:
# লেকচার - ড সাইয়েদ হুসেইন নসর - ফিলোসফি ম্যাটারস  http://www.youtube.com/watch?v=qAgGB407FHs